Tuesday, 18 December 2018
সই
লবণ
Monday, 17 December 2018
সই...
#সই
#মৌসুমী রায়
শিশির ধোয়ায়
স্বচ্ছ তোয়ায়
পথের ধারে
নদীর তীরে
ঝুমকো লতা
চিকণ পাতা
শীতের ভিড়ে
মুখের পরে
ভাবছি কবে
লিখব ভেবে
তোল চিবুক
ঋণ মিটুক
ওই আকাশ
ভাব শেখাস
জলকে চল
সই রে বল
তোর যত
গুণ এত
নেই ওরে
মোর তরে
বল রে বল
মন উতল
এমনি থাকিস
কথা বুনিস
ক্ষীণ আশা
বাঁধব বাসা
মনে রাখিস
বাসতে থাকিস
অনেক দিনের
কোণে মনের
এই আশায়
পলক হারায়
সেই আমার
ছোট্ট বেলার
নতুন দিন
ভুলিয়ে মলিন
বাঁচতে চাই
বেলা যে যাই
বন্ধু আমার
হয়ে সবার
এই বসন্তে
ভাবি একান্তে
সই এর গুণে
মুগ্ধ প্রাণে।।
Friday, 7 December 2018
#চড়ুই টি...
#চড়ুই টি..
#মৌসুমী রায়
আমাদের ফ্ল্যাটের বারান্দায় এখন ওরা ছোট্ট বাসা বেঁধেছে।
ভোরবেলা ঘুম ভাঙ্গায় ওরা শব্দ কোরে।
ঘর বাঁধার সময় বারান্দা নোংরা করত। বেশ লাগত।কত্তা গিন্নি আমরা ওদের নিয়ে দশ মিনিট সময় যাপন করতাম।
মাঝে মাঝে ঘৃতকুমারী গাছে বসে কিছু খুঁটে খায় , একবার বসে ; আবার ফুরুৎ কোরে উড়ে যায়।
ওদের চঞ্চলতা মনকে আনমনা করে দেয়। বলে ,অনেকদিন তো আকাশ দেখা হয়নি , একবার টি দেখ চেয়ে কত বিশাল।
মনটাও বড় এক কেন্দ্রিক হয়ে যাচ্ছে কী? ওঁরা জানতে চায়।
ঘরময় ওদের আনাগোনা চলে ।
জামাকাপড় এ মাঝে মধ্যে দোলখায় আর ইয়ে(বিষ্ঠা) করে।
কচি লঙ্কা গাছের পাতা গুলো কুট কুট করে খেয়ে ফেলে। খুব মন খারাপ হয়। আবার মন ভালো হয়ে যায় কিচিমিচি শব্দে। কখন কখন রোদ্দুরে পাখা মেলে ধরে।
ঝাপটে পালক গুলো ঝরে পড়লে ,রক্ত করবীর নন্দিনীর রঞ্জনের আগমনের কথা মনে আসে।
সাথে সাথে আমার বাড়ির সুখবরের আশায় আশায় রই। ফলেও যায় । কত যে আছে ওঁদের কথা বলেও শেষ নাহি যে কি বলব।
আবার ফুলের টবের মাটি গুলো খুঁড়ে ছড়িয়ে দেয়।
দুপুরে ভাত দেওয়া হয় ওঁদের।
খুঁটে খুঁটে খেয়ে ফেলে।
বিশ্রামে একজন অন্য জনের পালক ঝেড়ে দেয়।
দেখলে মনে হয় ,সোহাগে আবেশে আপন হারা।।
তোমার আবেশে আমার মন ও আপন হারা।
শুধুমাত্র সাধ ,ওঁরা কিচিরমিচির করে কী,ইচ্ছে করে শিখে নি।।।।
Wednesday, 24 October 2018
গান শেখানোর ক্ষমতা বাবার ছিল না। অসীমা রেডিও তে শুনেই তুলে নিত গলায়। বিশেষ কোরে ,বিকেলে ছায়াছবির গান ,রেডিওতে পরিবেশন এর সময় খাতা ,কলম নিয়ে হাজির থাকত ও। পড়া লেখাতেও ভালো ছিল। সবই ,অর্থের অভাবে বন্ধ হতে বসেছে। তখন এক চাকুরী জীবি পাত্রের সন্ধান এলো । প্রায় কুড়ি বছরের বড়। প্রথমে আপত্তি থাকলেও। ছেলের বাড়ি থেকে বলে অসীমা কে, ওরা পড়াবে ,গান শেখাবে যতদূর-- অসীমা চাইবে।
বাবা কৃষক ,জমি চাষে, যা আসে; সেটাই কুলোয় না। এমন সুপাত্র কেও ছাড়তে চাই। পাত্ররা দুই ভাই আর এক বোন। আর মা। বাবা গত হয়েছেন। বাবার চাকরীটা বড় ছেলে পেয়েছে।তার ওপর শহরে বিয়ে হবে। মেয়েটা খেয়ে ,পড়ে বাঁচবে। বাবা তো,মেয়ের সুখের কথা ভেবে রাজি।
গ্রামের এর ওর ,সাহায্যে বিয়ে সম্পন্ন হল।
প্রথম কয়েক মাস অসীমার আনন্দের সীমা নেই । প্রথমে বাপের বাড়ি খুব আসত। ইদানিং আসা যাওয়ায় খামতি ঘটেছে। বছর খানেক হল বিয়ে।স্বামীর রাত্রে ডিউটি থাকলে ,ননদ অসীমার সাথে থাকত।
----
অসীমা ,খাওয়া দাওয়া সেরে নিয়ে বাবা ,মায়ের সাথে গল্পে মশগুল। মা একটা বলে ,বাবা একটা বলে। আহ্লাদে আট খানা। অসীমার পোড়া জায়গাটা শীত কালে টান ধরে।আর শ্বশুর বাড়ির কথায় পোড়া জায়গা টা জ্বালাপোড়া করে।
ভাদ্র মাস চলছে। মাস গুলো অসীমা ওঁর বুদ্ধিতে, চির বসন্তের দেশে ,গুনে গেঁথে ঠিক করেছে।
এই ভাদ্রে পুজো আসার আগে ,অসীমার মা ,মাটির বাড়িটা নিকিয়ে ,চুকিয়ে ঝকঝক কোরে তুলতেন। চতুর্থী তে মাটির দেওয়ালে খড়ি মাটি দিয়ে চাঁদ আঁকতেন। অসীমা ,গিরিমাটি দিয়ে চারদিক টা বর্ডার দিত। বাড়িতে কুসুমফুলের বীজ ,ছোলা দিয়ে হলুদ চালভাজা ,মুড়ি ,মুড়কি ,নারকেলের নাড়ু তৈরী করতেন মা। খুব মজা। আর শুক্র বার করে রহমান চাচা গ্রামে নতুন জামা ,কাপড় বিক্রি করতে আসতেন। অসীমার একটা লাল সাদা ফুল কাটা ফ্রক কেনা হতো। মা ,বাবার তেমন কিছু কেনা হতো না। জিজ্ঞেস করলে বলতেন ,"তুই পড়লেই ,আমাদেরও পড়া হবে..... "পুজোর পরে বিজয়াতে জামার আঁচলে, নাড়ু ,মুড়কি আনতো অসীমা ;বাড়িবাড়ি বিজয়া কোরে।
অগ্রহায়ণ এলেই অসীমা ,পুতুলের বিয়ের আয়োজন করতো। ওঁর যে বার মেয়ের বিয়ে দিতে হতো ,সেইবার পণ এর আয়োজন করতো। সে এক মজার। অসীমাদের বাড়িতে ,কুটুম এলে; বিদায় কালে পাঁচ -দশ পয়সা দিয়ে যেত। অন্য সময় বাবা ,মা কে দিয়ে দিত। কিন্তু ,ওঁর মেয়ের সময় পণ দেওয়ার জন্য,আচার লজেন্স কিনতো। লজেন্সের সাথে নকল দু ,পাঁচ টাকার নোট দিত। সেই টাকা গুলো পুতুলের শ্বশুর বাড়িতে পণ হিসেবে দিত।
অসীমা এখানে বড়ি দিয়ে বেগুন আর আলুর তরকারি খেতে পায়না। আর পায় না মাছের টক।
এখানে চির বসন্ত। রোদ্দুর তেমন নেই ,বড়ি ভালো শুকোয় না। আর ,পুকুর থাকলেও মাছ চাষ হয়না। কারণ মাছ থাকলে ,এখানে থাকা যায়না। পুকুরে পদ্ম ফুলে ভোরে আছে। সেখানে সাঁতার ও কাটতে পারেনা অসীমা।
পৃথিবীর মত সুন্দর ,কোথাও নেই। সেই দেশ ,সে জন্মভূমি ,তাঁর মাধুরী আলাদা।
তবুও এখন বাবা ,মা কাছে আছে। অসীমা, মেয়ের জন্য সুস্থ ,দীর্ঘ জীবন কামনা করে। জামাই আর মেয়ের শ্বশুর বাড়িটা ভালো হয়েছে। নিশ্চিন্ত ,বাবাঃ।
ছেলের বাড়িথেকে পাকা কথা হোল। পণ দিতে ,অসীমার বাবাকে বেশ বেগ পেতে হয়েছিল। চাষের জমি বিক্রি করতে হয়েছিল। বিয়ের পরে থেকে দুবেলা ,দুমুঠো খাবারের যোগাড় করতে হিমশিম খেতো ওঁরা।
এভাবেএকদিন অসীমা মাধ্যমিক এ ভালো ফল করল। আর পড়া হোলো না। গায়ের রং চাপা ,তাই খানিক পণ দিয়ে ওঁর বিয়ে হোল।
মাঘ মাস এলেই শ্বশুর বাড়ির টাটকা সুখের কথা মনে পড়ে। তখন প্রথম প্রথম নতুন শাড়ি ,গয়না সবই পড়ত। আত্মীয় দের বাড়ি প্রথম একবছর যাতায়াত করত। আর ,একটা দেখত প্রায় প্রতিমাসেই একটা কোরে জীবনবীমা করত স্বামী। অসীমা আপত্তি জানালে বলত ওঁরা ,তুমি এ বাড়ির লক্ষ্মী ।
বছর দুই পর থেকে আপত্তি ,অভিমান কিছুই ধর্তব্যে আসতো না। এরমধ্যে অসীমা র কোল জুড়ে এক কন্যা সন্তান।
ওদের ধারণা ছিল ,ছেলে আসবে। অগত্যা মেয়েই সই।
এখন ও জীবনবীমা কিন্তু অসীমার নামেই। জীবনধারণের উপায় গুলো দূর্বিষহ অসীমার। পেটভোরে খাবারটাও দূর অস্ত। অসীমা বুঝেও ,বুঝে ওঠে না। কারণ ,মেয়ের মুখ চেয়ে। শ্বশুর বাড়ির এখন অনাদরের ধন মা ,মেয়ে।
লোকজন আসবে ,খবর পেলেই ;মা ও মেয়ের যত্ন খুব। তখন চিঠিদিয়ে আসতেন। সময় টা বেশ পাওয়া যেত।
অসীমাকে চিঠির ভিতরের কথা জানানো না হলেও ,আদরযত্নের বহরে বুদ্ধিমতী মেয়ে বুঝে যেত। কিন্তু ,ওই যে ইদানিং কিছুই আর ধর্তব্যে নেই অসীমার। শুধু জীবনবীমার কাগজে সই ছাড়া।
সই করতে আপত্তি করলে ,মেয়েটার ক্ষতিকরার ভয় দেখাত ঠাকুমা ,কাকা ,পিসি। এমনকি বাড়ির আগের কাজের মাসিটা। এখন অবশ্য সবকাজ অসীমা করে। এই সব আবার মনে পড়তেই অসীমার পোড়া গুলো ,আরও জ্বলে পুড়ে যাচ্ছে।
সেই ,দু বছর বয়সে মেয়েটাকে ছেড়ে এসেছে। তখনও ,মায়ের দুধ খেত। এখন অনেক বড় হয়েছে।স্বামী ,সন্তান নিয়ে সুখে আছে।
এখন যারা এপারে আসেন ,তাঁরা অসীমা কে বলেন ,খুশী ;মায়ের জন্য কাঁদে। মায়ের জন্মদিনে ,দুঃস্থ মায়েদের সাহায্য করে।
অসীমার ,শ্বশুর বাড়ি দূরে ছিল। এখন ওদের পাশেই। স্বামী ,দেওর আর শাশুড়ি থাকে। ওরা যোগাযোগের চেষ্টা করলেও ,অসীমারা পাত্তা দেয় না এখন। অসীমারা ,তিন জন দিব্যি আছে। মেয়েটার শুভ কামনা করে ,দীর্ঘ জীবন আর শান্তি যেন পায় ;এটাই অসীমার এখন চাওয়া।মাঝে মাঝে শ্বশুর বাড়ির কথা মনে পড়লেই ,পোড়া দাগ গুলো বড্ড জ্বালাপোড়া করে।
এরা সকলে ,অসীমা কে ঘিরে রাখত ,লোকজন বাড়ি এলে। ফাঁকা সময় দেখে ,এক প্রতিবেশী কাকিমা কে কিছু বলার চেষ্টা করত অসীমা । কিছু বলে উঠতে পারত না। "কাকিমা "-----ডাক দিয়েই চুপ করে থাকত। চোখদুটো জলে ভরে উঠত।
বিয়ের বছর তিন পরে ,এক শীতের রাত্রে।
খুশী তখন বছর দুয়েকের। মামা বাড়িথেকে বিজয়া করে এসেছে। অসীমার বিয়ের পর এই প্রথম বাপের বাড়ি বিজয়া করতে গিয়েছিলো। পুজোর সেই ,ছোটবেলার আনন্দ।হলুদ মুড়ি ,কুসুম ফুলের বীজ ভাজা ,ছোলা ভাজা ,কুমড়োর বীজ ভাজা দিয়ে ,নাড়ু নারকেলের ,সিড়ির নাড়ু ,মুড়কি অসীমার মা নিজে হাতে তৈরী করেছেন। অসীমা শাড়ির আঁচলে সর্ষের তেল মাখানো মুড়ি খেতে খেতে ,ছোটবেলার কথা অনর্গল বলে চলেছে। অসীমার স্বামী তুলনামূলক ভাবে শান্ত মানুষ। আর এখানে তাঁর মায়ের শাসন নেই। জামাই আদর যতটা পারেন অসীমার বাবা মা ,তার চেয়েও বেশী আপ্যায়ণ করছেন।
ছোট্ট খুশীকে মায়ের কোলে রেখে ,গ্রামের পরিচিত দের সাথে দেখা করতে বেড়িয়ে পড়েছে অসীমা। মোটে দুদিন থাকবে। তাই সব্বাইকে একবার দেখে যেতে চায় ও। এতো কষ্ট অসীমার ওখানে। কেও টের পাচ্ছেনা ওর আনন্দ আয়োজনে। পুকুর ধারের বটগাছটা ,কাশফুলের গোছা ,বিশু কাকা ,সব সব একবার কোরে বুড়ি ছোঁয়ার মতো ছুঁয়ে যাচ্ছে। অসীমার মনে হচ্ছে এই শেষ দেখা ,আর বুঝি হবে না। পুরোনো স্কুল থেকে খাল ,বিল সমস্ত জায়গা গুলোকে একবার দেখা করে। আহঃ কী তৃপ্তি ?
মা ,বলে আর থেমে যায় অসীমা। কিছু বলতে পারেনা। মায়ের সামনে সব ভালো ,ভালো আছি মা ;এমনটা দেখানোর চেষ্টা অসীমার। মায়ের মন কু ডাকছে। অসীমার এই ভালোটা শুধুই দেখানোর ,অন্তরের নয়।
আসা যাওয়ার ,কিছু বলা না বলার মাঝে বিদায় কালে অসীমার অঝোর ধারা খানিকটা হলেও বাবা আর মা কে ভাবিয়ে ছিল। খুশী কে কোলে নিয়ে বারবার পিছনপানে চাইছিলো অসীমা। ঠোঁট দুটো কাঁপছিলো ,এ কান্না তো সেই কান্না নয়।
পৌঁছানো পত্র সাতদিনের মধ্যে এলো। খুশীর গল্পে দাদুদিদার দিন কাটছে। খুশী ,অসীমার মেয়ে।
দিন দশেক পর অসীমার মা ,অসীমার বাবাকে বলছে ; একবার মেয়েটাকে দেখে এসো। মনটা বড়ই কু ডাকছে।
সেইমত জোগাড় যন্ত্র কোরে বাবা রওনা দিলো অসীমার বাড়ি। পুজোটা দেরীতে ছিল এবার। ঠান্ডাটাও এই কাত্তিকে বেশ জমিয়ে পড়েছে।
অসীমার বাবা ওদের বাড়ি ঢোকার মুহূর্তে দেখে পুলিশের গাড়ি ,আর লোকজনের জটলা। ভেবেছেন অন্য কোথাও কিছু হয়েছে বুঝি। কানে টুকরো কথা আসছে বাড়ি ঢুকতে ঢুকতে। আহারে ,মেয়েটা বড় ভালোছিলো ,বাঁদরের গলায় যেন মুক্তোর হার, এই ভাবে নির্যাতন কোরে ,পুড়িয়ে মারলো। ঈশ্বর ওদের কখনও ক্ষমা করবেননা। জেল হবে ,ফাঁসি হবে। শুনতেশুনতে অসীমার্ বাবা বলেন ,কার কথা বলছেন আপনারা ? উত্তর শুনে পথশ্রান্ত বাবা সেই দরজার মুখেই বসে পড়লেন। বলতে থাকেন,হে ঈশ্বর ,আমার শিবরাত্রির সলতে টাও নিভিয়ে দিলে। ওঁর মা কে কী বলব।
-----
শীতের সেই রাত্রে অসীমার কাছথেকে খুশীকে ছল কোরে সরিয়ে নিয়েছিল ,শাশুড়ি ,ননদ আর দেওর। স্বামী ডিউটি তে ছিল সেদিন।মাঝরাতে দরজায় কড়া নাড়ার শব্দে দরজা খুলতেই অসীমার মুখ চেপে ধরল দীর্ঘদেহী দেওর ,ননদ আর কাজের মাসি। কাজের মাসি আগে ছিলো ,অসীমার বিয়ের পর বাড়ি ছাড়লেও যোগাযোগ ইদানিং বেড়েছিল।
দুজনে পিছমোড়া কোরে হাত বেঁধে টানতে টানতে বাড়ি থেকে অনেকটা দূরে ফাঁকা মাঠে ,যেখানে সব আয়োজন ছিল ,সেখানে এনে ,পাশবিক নির্যাতন চালিয়ে ,জীবন্ত দগ্ধ করে ওরা অসীমাকে। এক নিস্বাসে যেন সব শেষ হোলো। চুপিচুপি সেই রাতেই বাড়িতে এনে ,একটা আমগাছ ছিল সেখানেও আবার পোড়ালো।লোকজন কে বলা হোল নিজেই পুড়ে মারা গিয়েছে অসীমা।
এপারে আসতে ,তিনবার পুড়তে হয়েছে ওকে। জিভের স্বাদকোরক গুলো আর নেই। মাছের ঝোল ,টক ,ঝাল প্রিয় ছিল অসীমার।উফঃ আর পারেনা। এখানে চির বসন্ত তাই রক্ষে।গরম হলে চিড়বিড় করত।
------
প্রথমে অসীমার হত্যা কারীদের কোন শাস্তি ই হয়নি। ভাগ্যিস ,পাড়াতুতো ওসি কাকুর সাথে অসীমার বাবার গ্রামের বাড়িতে দেখা হয়ে যায়। তখন সব খুলে বলেন অসীমার বাবা। আবার কেস পুনরায় আদালত অব্দি গড়ায়। কাজের মাসি রাজসাক্ষী হয়। সব খুলে বলে। জীবনবীমার টাকা হাতাতে অকালে অসীমাকে হত্যার পরিকল্পনা করা হয়।
কাজের মাসিকে টাকার প্রলোভন দিয়ে কাজ হাসিলের চেষ্টা করে ওরা। এও জানা যায় অসীমার স্বামী কে প্রায় মানসিক রুগী তে পরিণত করা হয়। এই ভেবে চাকরিটা যাতে ছোট ভাই পায়।
কিন্তু অসীমার মৃত্যুর এক বছর পরে অসীমার স্বামীর মৃত্যু হয় হার্ট এর অসুখে।
আদালতের রায়ে , শাশুড়ি ,ননদ আর দেওরের সাজা ঘোষণা হয়। স্বামী ওই দিন অনুপস্থিত থাকায় বে কসুর খালাস পায় ।
জেল খাটার সময় শাশুড়ির মৃত্যু হয়। সাত বছর পর ননদ আর দেওরের মুক্তি হয়।
কী পোড়া দেশ অসীমার ? দেওর আর ননদের বিয়েও হয়। গরীব বাড়ির দুটি ভালো ছেলে ,মেয়ের সাথে। একটি সন্তান রেখে দেওরের অজানা অসুখে মৃত্যু। ননদ এর খবর এখন অজানা। মানে খুশী জানে না। কাকিমা আর ভাইয়ের সাথে খুশীর যোগাযোগ আছে।
অসীমা অকালে চলে যেতে ,ছোট্ট খুশী তখন দাদুদিদার কাছে। ও বড় হচ্ছে। কলেজের পরে একটি সুন্দর মানুষ এর সাথে বিয়ে হয়। ও খুব সুখী।দুটি ফুটফুটে যমজ ছেলেমেয়ে ওঁর। খুশী মনে করে এঁরা ই খুশীর ,বাবা আর মা হয়ে এসেছে।
মা ,বাবার কাছে খুশীর খবর পেয়েছে অসীমা।
এখন অসীমা সেই ছোট্ট মেয়ে। খুশীর খুশীতে খুশী বাবা ,মা আর অসীমা। ..........
সমাপ্ত
,
Saturday, 7 July 2018
--একবার হল কী ,রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের "পথিক "কবিতা অবলম্বনে পাক্কা আধঘন্টার এক পলকহীন অনুষ্ঠানের আয়োজন। তাঁর মধ্যমণি কেও ছিলোনা ,কিন্তু অপূর্ব এক অভিনবত্ব এনেদিয়ে ছিলো। বলা বাহূল্য রবি ঠাকুর একাই সব। তবুও যথাযথ পরিবেশনের দায়িত্বও কম নয়।পাড়ার দাদাদের স্নেহের ও শাসনের সুবাদে।মুসকান ,ওর মা এবং মুসু আর রূপটান এর পরিবেশনা। রূপটান ও খুব মিষ্টি। শ্যামলা বরণে আরও মাধুরী।পঁচিশে বৈশাখ ,সকাল সকাল উঠে বেশ উৎসবের মেজাজে দুই বোন। অন্যদিন দেরীতে ওঠে ,তাও আবার ওঠরে ,ওঠরের ফল। ওদের কলেজ থাকে যখন তখন সেটা বলতে হয়না । দুইজনেই নৃত্য এবং সঙ্গীত নিয়ে পড়ছে।
সকলেই বেশ আগ্রহী। মায়ের পাঠের মধ্য দিয়ে শুরু অনুষ্ঠান। "পথিক ওগো পথিক ,যাবে তুমি এখন এ যে গভীর ঘোর নিশা ---বিদায়পথে দিয়েছি বটে বাধা "গলার ওঠানামার করুণ আবহে রূপটানের মিষ্টি গলায় "মোরে বারে বারে ফিরালে ,মোরে --"সুরের মূর্ছনায় দর্শক আপ্লুত। আবার শুরু "পথিক "কবিতার পাঠ। "পথিক ওগো মোদের নাহি বল ---রয়েছে শুধু আকুল আঁখিজল " কত্থকের শৈলীতে "কাঁদালে তুমি মোরে "গানের সাথে মুসকানের নৃত্য পরিবেশন এক অন্যমাত্রা এনেছিল। আবার শুরু "তিমির রাতি --হৃদয়ে তব আসিল অবতরি "রূপটানের গলায় "আজি এ নিরালা কুঞ্জে আমার অঙ্গ মাঝে "ঝোরে পরছে "লতায় লতায় "শব্দের অর্থে। পরিবেশ স্তব্ধ ,সেখানে একজনের অস্তিত্ব তিনি স্বয়ং রবি ঠাকুর।
আবার শুরু পথ চলা পথিকের। "পথ পাগোল পথিক ,রাখো কথা ,নিশীথে তব কেন এ অধীরতা।"রূপটানের গানে মুসকানের নৃত্য "হায় অতিথি ,এখনি কি হোল তোমার যাবার বেলা --
---আমোদ আহ্লাদ উছলে পড়ে বোধকরি পরিবারটি । আড়ালে মুসু আর রূপুর কথপোকথন শোনে ওদের মা। কত কথা তার শেষ নেই।আজ ওদের বিষয় পাহাড়। সান্দাকফু ভ্রমণ ওদের মনে আনন্দ দিয়েছিলো। মানেভঞ্জন থেকে হাঁটার কথা ছিল ,পরে গাড়িতেই যাওয়া হয়েছিল।পৌঁছনোর চার কিলোমিটার আগে গাড়ি বিকল। এবার হাঁটতে হবে। বেশ আনন্দ হচ্ছিলো প্রথমে। রাস্তা এতো খাড়া যে অংকের জ্যামিতির কথা মনে পড়ছিল। কখন পঁয়তাল্লিশ ডিগ্রি কোণ তো কখনো ষাট ডিগ্রি। বুকের ভিতর পাথরের বোঝা নিয়ে পাহাড়ে ওঠা। সে এক প্রাণবায়ূ বেরোনোর উপক্রম। চলতে চলতে কাজু ,কিশমিশ দুচারটে মুখে চিবোতে চিবোতে একঢোক একঢোক জল পান। এই মুসু ,রূপুর ডাকে পাহাড়ের গায়ে লেগে প্রতিধ্বনি এক অনুরণন সৃষ্টির দুনিয়ায় পৌঁছে যাচ্ছিল। রুক্ষ পাহাড় এর গায়ে গাছ গাছালির পোশাক পড়েছে। পাহাড়ী ফুলে ফুলে অলংকারের সম্ভার সাজিয়ে রেখেছে। রঙিন ফুল দুই বোন চুলে গুঁজে নিচ্ছে ,মায়ের খোঁপায় গুঁজে দিচ্ছে। দুই বোনে ভূপালী সুরে তান বাঁধছে। এই সব চলছে চলার পথে যখন একটু জিরিয়ে নিচ্ছে ওরা। মা ওঁদের গল্প শুনছে আর ঝালিয়ে নিচ্ছে নিজের আনন্দটাও।বাবা তো বোমভোলা। মেয়েরা প্রাণ ভোমড়া। ঠাম্মি , দিম্মী মানে ভঞ্জনে আছেন নেপালী মহিলা পরিচালিত হোটেল এ। নেপালী মেয়েদেরও ঠাম্মি ,দিম্মি।
---পাহাড়, পুরুষ এবং মূর্তিমান হলে কি হবে তার স্নেহ ভালোবাসার সম্পূর্ণতা যেন বাবার মত। কোথাও প্রশ্রয় তো কোথাও নিষেধ। যেমন ধর পাহাড়ের সৌন্দর্য উপভোগ কর এটা প্রশ্রয় আর খাদের কিনারে যেতে বারণ এটা নিষেধ। পাহাড়ের অলিখিত নিয়ম। এক পুরুষের কত ভাগ ,যেমন কখনো সে সন্তান ,কখনো ভ্রাতা আবার কখন সাথী বা বন্ধু ,আবার জীবনে চলার পথের সঙ্গী এবং পিতা।
মুসু আর রূপুর উপলব্ধি একই। পথে চলতে চলতে পুরুষের বিশ্লেষণ ওদের মা কে জানান দিলো ওরা সাবালিকা। আর চিন্তা নেই ঠিক পথেই ওরা এগোচ্ছে। পৌঁছে যখন ওরা বিশ্রাম নিচ্ছে তখন সন্ধ্যে নেমেছে। আকাশ ভরে জ্যোৎস্না আর কিরণ লেগেছে পাহাড়ের কোণে কোণে। যেন লাবণ্যে পূর্ণ প্রাণ। গানে গানে ভোরে উঠল মোহময়ী রাত।
ফেরার পথে গাড়ি পাওয়া তে সবাই খুশী। রাস্তায় পাহাড়িমেয়ে ,বাচ্চাদের দল সে এক বসন্ত সমাগম। ওদের হাতে চকলেট ,কাজু ,কিশমিশ দিচ্ছে মুসু ,রূপু। চা খেতে নামার ফাঁকে একটু এদিক দেখা ,মানুষের সাথে কথাবলা। খুব মিষ্টি ওরা। সরলতায় স্পষ্ট বার্তা দিচ্ছে গোলাপী গালের চ্যাপ্টা নাক এর ঝলমলে চোখের মুখ গুলো। মেঘমা ,টুমলিং ,গৌরীবাস জায়গার নাম গুলো মানুষ গুলোর মত সুন্দর। পাহাড়ের একলা পথে যেতে যেতে পাহাড়ী ছেলেদের সহযোগিতা মুগ্ধকর। হাসি মুখের অধিকারী সম্প্রদায় পাহাড়ি মানুষরা।
রূপু ,মুসুদের পাহাড় কে পুরুষ কল্পনা করে নানান পর্যায় ভুক্ত করেছে। পুরুষ না থাকলে নারী র সৌন্দর্য অপূর্ণ।
----নদীর গতি ধারাকে নারীরূপে কল্পনা। একেকদিন ছুটি পেলেই দুই বোনের কল্পনা বন্যা বইয়ে দেয়। ওদের দুই পুরুষ বন্ধু আছে রুনু আর ঝুনু । ওরাও ছুটির দিনে যোগদেয় আদর খায় ওরাও আদর করে।মুসু আর রূপু দের । জ্বর জ্বালা সবই যমজের যমজ। বোধকরি চিন্তা ধারাও একই। দুজনেই মেধাবী। একজন নাচে আর একজন গায়। এভাবেই ওদের আলাদা করা যায় নচেৎ নয়। ও হ্যাঁ আজকের ছুটির দিনে ওদের বিষয় নদী। ওঁরা যখন আলোচনা করে তখন নিশ্চুপ শ্রোতা রুনু আর ঝুনু । কোনো উৎপাত নেই ওদের। বরং আলোচনা র থেকে অন্য কিছু ঘটলে মারাত্বক। রুনু আর ঝুনু তখন নিজেদের মতো কোরে কলহ জুড়ে দেয়। তখন বোনেরা মূল আলোচনায় ফিরতে বাধ্য হয়। হ্যাঁ ওই যে বলছিলাম আজকের খবর নদী। নদী ওঁদের চোখে কেমন মেয়ে ,মা ,বধু। উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষার পরে ওরা গোমুখ বেড়াতে গিয়েছিল বাবা মায়ের সাথে। পথে র সাথী নদী। চিরবাসা নামে একজায়গায় খানিক বিশ্রাম নিয়ে আবার হাঁটতে লাগলো। ভুজবাসা তে রাত্রি বাস। জ্যোৎসনা ভেসে গিয়ে পাহাড় কে স্নান করিয়ে দিচ্ছে। পরের দিন গোমুখের উদ্যেশ্যে রওনা। কুলকুল বয়ে চলছে আপন বেগে আপনহারা মাতোয়ারা স্বচ্ছতোয়া । নদীর বয়ে যাওয়ার প্রবণতা সৃষ্টি রূপে ধরাদিয়েছে। এখানে ই নদী নারী। যে না থাকলে সৃষ্টি থেমে থাকত। কিছুদূরে দেখাগেলো জলের উপর বরফের টুকরো ভেসে ভেসে চলেছে। এর মধ্যে খুঁজলো নারীর ধারণ ক্ষমতা। গর্ভে যেমন ভাবে সন্তান কে বয়ে নিয়ে চলে তাঁর মা ,ঠিক যেন তেমনই ,কোনো ভার লাগেনা মায়ের মতো। চলতে চলতে নদীর উৎস স্থল গোমুখের সম্মুখে। এ যে নারীর সম্পূর্ণ রূপ। কন্যা -বধু -মাতা। সর্বং সহা। পাথরে ধাক্কা খেয়ে এঁকে বেঁকে নদী প্রতি বন্ধকতা কে ভেঙে নিজের গন্তব্যে পৌঁছচ্ছে। এই হল নারী শক্তি। যতই বাধা বিপত্তি আসুক নারী পৃথিবীর নাড়ির স্পন্দন।
---------আজ মুষলধারে বৃষ্টি পড়ছে। রুনু আর ঝুনু আজ দুষ্টুমী একটু বেশী মাত্রায় করছে। ওদের শান্ত করার একটাই ওষুধ। ওষুধ গান।বাইরে বৃষ্টি ঘরে রুপু গাইছে "এমন দিনে তারে বলা যায় "কি সুরেলা কণ্ঠ। প্রাণ জুড়িয়ে যায়। পরপর গেয়ে চলেছে,"নিবিড় মেঘের ছায়ায় মন দিয়েছি মেলে "ওগোপ্রবাসিনী "যখন গাইছে মনে হয় যেন সে কোন সুদূরে বসে শুনছে এপারের কথা। আহা। ওঁরাও আজ স্তব্ধ। বোনে বোনে আজ কথায় গানে রবিঠাকুর এর গানে কণিকা বন্দ্যোপাধ্যায়,সুবিনয় রায় ,আশীষ ভট্টাচার্য থেকে ঋতু গুহ। বেগম আখতার থেকে গুরুদাস মান ,দলজিৎ ,অরিজিৎ সিং।এর মাঝে রুনু ,ঝুনুর প্রিয় গান বাজানো এবং ওদের swag নাচ হল। digy bom bom .এই ওষুধ পড়েছে ব্যস আর চিন্তা নেই। মুসুদের কথায় আর বিরক্ত করবে না ওরা।
রবীন্দ্রনাথের গানে এই প্রাতঃস্মরণীয় দের চিন্তা ধারায় রূপু অনুসরণ করে। অনুকরণ করেনা। বেগম আখতারের "মেরে চেহেরে সে গম "গানটি প্রায় গাইতে চেষ্টা করে। চেষ্টা করে ঊর্দু উচ্চারণটা সঠিক করতে। আর দলজিৎ থেকে অরিজিৎ গান চালিয়ে মুসুর কথ্থক নৃত্য। সে যেন দেখেও আর শুনেও শান্তি। ওরা সবাই খুব আনন্দে থাকে। সব খুশির মাঝে দুঃখ এলেও ভেঙে পড়েনা পরিবারটি। মুসু ,রূপু এখন শিক্ষক। একজন নৃত্যের এবং একজন সংগীতের।
----আজকে ওঁদের রবিঠাকুরের নারী শক্তির বিন্যাস চলছে। রুনুঝুনু সামনের পা দুটি টানটান করে মেলে দিয়েছে। এ যে গভীর বাণী তাই উঁচু হয়ে আছে তাদের শ্রবণ যন্ত্র দুখানি।বিষাদ ,আনন্দ ,অবকাশ এমনকি অবসাদে যাঁর শব্দের ভীড় নৈঃশব্দে কথার সমৃদ্ধি ঘটায়। অপ্রকাশ মেঘে কখন যে স্বপ্রকাশ র রোদ্দুর আনে বোঝা কঠিন। মেঘের বিকেলে মন কেমনের রসদ। রাতের স্বপন গুলো যখন মোহে অজানায় মিলিয়ে যেতে চায় তখন তাঁর শক্তি ঠাওর হয়। রুনু ঝুনু দুই দিদির ভাষায় সড়গড়। আজ ওরা চুপটি কোরে লক্ষীটি।
পাহাড় ,নদীর মিলন এর সৃষ্টি ঝর্ণা। সে চঞ্চল কিন্তু মধুর। পাহাড়ের অহং নদীর শান্ত রূপে আর কলধ্বনিতে মজে যায়। প্রকৃতির দৈনন্দিন ওঠাপড়া যেমন সহজে নজর আসেনা কিন্তু সমস্ত টাই তাঁর দেওয়া। তেমনি নারী শক্তির দর্শন রবি ঠাকুরের সৃষ্টি যা জীবনের ওঠাপড়ায় সমৃদ্ধ ঘটায়। বাসব দত্তা প্রতিকারে ব্যস্ত ,পুরী দর্শনের পরে রানীর অসহনীয় এবং প্রমোদ প্রিয় যেমন ঠিক তেমনই তাঁর সহচরীর নিষেধ এক অন্য মাত্রা আনে। চিত্রাঙ্গদা নারী জাতির পুরুষ ও নারীর মেলবন্ধন যা প্রত্যেক নারীর নাড়িতে। প্রকৃতি সে নিজেই সংস্কারক। কুন্তীর মাতৃত্বের স্বীকারক্তি। রক্তকরবীর নন্দিনী। সবই মেয়েদের শক্তি যেখানে লুকানো কিছুনেই। ঘরে ছয় টি নারী একটি পুরুষ মুসুদের। সেই বাবাকেও তাঁরা তাঁদের সম্মান দেয় এবং বাবাও ওঁদের মান দেন্।রুনুঝুনু ও সদস্য ।নিমন্ত্রণ বাড়িথেকে ওদের খাবারের বাক্স আসে।
বাইরে আষাঢ়ের পূর্ণিমা, জানালা দিয়ে জ্যোৎস্না ভেসে আসছে একজন গাইছে, "ও আষাঢ়ের পূর্ণিমা" আমার আর অন্য জন নৃত্যের আবেশে, আর ওনারা জুলজুল করে চেয়ে আছে। দিম্মি ঠাম্মি ওদের সমালোচক। মায়ের ভাবনা মেয়েরা তো বড় হচ্ছে। স্বাবলম্বীর পরে পাত্রস্থ করতে হবে। আর বাবা ভাবছেন এমনি করে যায় যদি দিন যাক না। মেয়েদের ,বাবা ঘরের আড়াল করতে চাই না। বন্ধুদের মেয়েদের পাত্রস্থের পূর্বের ও পরের অবস্থান এ কয়েকটি পরিবার তাঁর কেমন যেন ঠেকে।
--------আজকে সন্ধ্যেটা বড্ড আনচান করছে তাঁর। একবার ঘর একবার বাহির করছে। পায়ে পায়ে লটা পটি করছে রুনুঝুনু। তবুও সন্ধ্যে বাতি দিয়েছে। রাত ক্রমশঃ বাড়ছে। ওঁদের বাবাও ফেরেনি এখন ও। আর দুই বোন ও ফেরেনি আর ফেরার সময় ও হয়নি। বন্ধুর জন্মদিনের অনুষ্ঠানে গিয়েছে। আজ রান্না করতে বারণ করেছে মেয়েরা আসার পথে খাবার নিয়ে আসবে।আজকের রাতে জোছনার আড়ি। গাঢ় আঁধারে দিক শূন্য। মায়ের ভাবনায় আত্ম বিশ্বাসের সুগন্ধী ভরপুর। দিম্মি ঠাম্মিও দৃঢ় মানসিকতার। মনোস্কামনা মিষ্টতায় আচ্ছন্ন। স্বভাবে সততা ,প্রায় অর্ধেক জীবন গোলাপের মধুরতায় ভরা। সবই তাঁর দুই কন্যা ঘিরে। ওরাই পৃথিবীর দুই গোলার্ধ। অনেক ঘাটতি জীবনের মুশকিল আসান ওই মেয়েরা। জীবনের অর্থ বহ সময় চলে গিয়েছে অনেকে বলে এটা করতে পারতে ,ওটা করতে পারতে। কিছুতেই কান দেয়নি ,তাঁর ভাবনা ছিল জীবনটা আমার ,কেমন চালাব সেটা নিতান্ত নিজের। হাওয়া কখনো এক দিকে বয় না। এখন যেদিকে বইছে সেইদিকেই বইব এই চিন্তা ধারার ওদের মায়ের। এখন শুধুই এঁরা। উদাস হাওয়ায় মন কে পাখি ভেবে কত ভাবনা আষ্টেপৃষ্টে এই মুহূর্তে। সারাজীবনের পাওয়া না পাওয়া সব কিছুই ইচ্ছে র আকাঙ্খা। সেখানে কোনো দুঃখ এবং কম বা বেশী পাওয়ার নয়। কাঁটার আঘাতে ফুল কোনো কলঙ্কর ভাগীদের হয়না। কিন্তু ফুল যখন চুপচাপ আহত করে তখন ই সইতে পারা দুঃসহ। কত কী ভাবনারা কি হাওয়ায় মাতাল আজ অন্য সমীরণে। নিকষ আঁধারে একলা পথিক চলতে চলতে ওই পথ হারালো বুঝি। শুনিস নি কি শুনিস নি তার পায়ের ধ্বনি গানটা হঠাৎ গলায় সুর পেলো। অনেকদিন পরে নিজের জন্য সময় এলো কাছে। গান শেষের ক্ষণেই দরজায় টিংটং।বিধ্বস্ত দুই মেয়ে। খানিক বাদে ই ওদের বাবা। রুনুঝুনুর চঞ্চলতা খুব বেড়ে গিয়েছে।ঠাম্মিরা খুশী ওরা অক্ষত।
-----মুসু আর রূপুকে খুব তৃপ্ত লাগছে এখন। অনুষ্ঠানের পর ওরা রাত আটটা র মধ্যেই ফিরছিলো। একেতো অন্ধকার তার মধ্যে টিপ্ টিপ্ বৃষ্টি পড়ছে। রিকশা নিয়েছিলো। মা বলেছিল তাড়াতাড়ি ফিরতে। সেই সকাল থেকে কুর্চির বাড়িতে। খুব আনন্দ করেছে। কুর্চিদের বাড়িথেকে আসতে একটা মাঠ পেরোতে হয়। ওখানে এখন সমাজ বিরোধীরা ভীড় জমায়। মুসুদের যাওয়া আশা করতে দেখে প্রায়। কিছু বলেনা ওরা । রিকশাতে ফিরতে ফিরতে দুই জনে ভয় কাটানোর জন্য সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় এর কেও কথা রাখেনি জোরে জোরে আবৃত্তি কোরে চলেছে। রিকশা কাকুও চেনা। কাকুও বেশ গতিতে চালাচ্ছে। কবিতা শেষ হতেই মাঠ পেরোনোর মুখে গোঙানির শব্দ। কেও কাওকে ছেঁচড়ে নিয়ে যাচ্ছে শব্দ আসছে। দুই কন্যা বরাবরের ডাকাবুকো। বলে ,কাকু রিকশা থামাও। সেতো শুনবেনা ,বলে তোমার মা বলেছে নিরাপদে বাড়ি পৌঁছেদিতে তোমাদের। ওরা নাছোড় বান্দা। এক লাফে নেমে শব্দের হাওয়ায় এগিয়ে চলেছে। পিছনে রিকশাতে তালা দিয়ে কাকুও। দেখে দুই টি ছেলে মেয়েটিকে মুখে ওড়না গুঁজে দিয়ে হাতে পিছমোড়া করে টেনে নিয়ে যাচ্ছে। এরাও উর্দ্ধশ্বাসে ছুটতে ছুটতে ক্যারাটে র ফাঁদে কাত কোরে ফেলেছে। দুই বোনে দুই জনকে উত্তম মধ্যম। আর রিকশাকাকু মেয়েটিকে বাঁধন মুক্ত করছে।
দুই বোনের ক্যারাটে শেখা আছে। ওরা সব সবুজ ,কালো বেল্ট ও পেয়েছে এই প্রশিক্ষণে। তার মধ্যে দুই বোন কেশবতী কন্যে। ওরা চুলের বন্ধনীতে সবসময় ধারালো বক ক্লিপ রাখে। চাণক্যর ন্যায় দণ্ডের মতো ওরা বয়ে চলেছে ক্লিপ।
প্রথমে কুপোকাত কোরে ,শরীরের নানান জায়গায় বক ক্লিপের চিহ্ন এঁকে দিয়েছে। শয়তানরা যন্ত্রনার পাথারে কুল খুঁজে পাচ্ছে না। মেয়েটিকে নারকীয় অত্যাচার থেকে বাঁচিয়ে ,একটা মানুষের মত কাজ করেছে।
মেয়েটি জানায় যে বাড়িতে ওর ছোট মেয়ে আছে ,মা আছে আর নেশা খোর স্বামী আছে। সেই ভোর বেলা রান্না করে ,ওদের খাবার গুছিয়ে ,মেয়ের স্কুল এর সব গুছিয়ে এখানে হাসপাতালে আয়ার কাজে আসে। আজ কে ডিউটি বদলাতে দেরী হয়েছে। দুটো পয়সা বাঁচানোর জন্য আজ প্রায় ছুটতে ছুটতে বাস স্ট্যান্ডের দিকে যাচ্ছিল। নইলে এই বাস চলে গেলে ফিরতে ফিরতে রাত এগারোটা হয়ে যাবে। স্বামী সন্দেহ করবে ,নেশা করবে ,পেটাবে। মেয়ের সামনে গালাগাল পারবে।
-------মুসুদের সঙ্গে মেয়েটি এসেছে। ওর আজ বাড়ি ফেরা হয়নি লাস্ট বাস চলে গিয়েছে। ওর সম্মান রক্ষা হয়েছে আজ। স্বামী যতই মারধর করুক ,গালমন্দ পারুক। মেয়ের জন্য চিন্তা হচ্ছে ,কিন্তু ওর দিদা সব সামলে নেবে। দিদা এবং নাতনী মালতীর সহায়। মেয়েটির নাম মালতী।
আকাশ যেমন ছিল তেমনই আছে ,শুধু মনের আকাশে আঁধার। অংক ,ফলাফলে কবিতার মত ছন্দে ঝোরে পরে মিলনের সাথে ,জীবনের যোগ বিয়োগে দেহ মনে উথাল পাথাল। সূর্যের আলো কোথাও কম পড়েনি ,মনের আলোকপাত এ আজ খানিক কম পড়েছে।জ্যোৎসনা মাখানো মায়াবী রাতে সুরের বন্যা ভাসানো ভেলায় আজকের যাত্রীর হৃদয় অমাবস্যার ঘরকন্যা। ব্রহ্মান্ড জুড়ে নক্ষত্রের পসারী ,কিনবে যে মন সেই মন আজ কে শুধুই ভিখারী। মালতীর মনে আজ কী ঘটে চলেছে তার টের পাওয়া যাচ্ছে অসহায় চোখের চাহনি তে। মুসুদের বাড়িতেও চলছে মনের দুর্যোগ।
আজকে মুসু ,রূপুদের বাড়িতে আকাশের যেমন করে গাওয়ার কথা তেমন ভাবেই গাওয়ার কথা ছিল ,কিন্তু আজ বেসুরো পরিবেশ। ওঁরা কোথাও থেকে ফিরে কত গল্প জুড়ত আর শ্রোতা ঠাম্মি ,দিম্মি , বাবা ,মা ,রুনু ঝুনু। বিশেষ আকর্ষণ রুনুঝুনুর টানটান পা মেলে জুলজুল চোখে চাওয়া আর মাঝে মাঝে একটা মিষ্টি আওয়াজ। আজ কিছুই নেই। আজকের শুধুই মালতী। মালতী বলে ওর প্রিয় কবি জয় গোস্বামী। প্রিয় কবিতা বেণীমাধব তোমার বাড়ি যাব। আরও বলে কবির র মালতী সেলাইয়ের দিদি মণি আর এই মালতি হাসপাতালের আয়া রাণী। রাণী কথাটা বুঝেই বলেছি দিদি ,কোন কাজকে ছোট ভাবিনা ;এর বিনিময়ে আমার সংসার চলে। বলতে বলতে হঠাৎ বলে --অভাবে আমিও "যদি নষ্ট মেয়ে হই "...
জানো আমিও তোমাদের মতই বড় হচ্ছিলাম। বাবা ,মা খুব স্বপ্ন দেখত আমাকেও দেখাত ,একদিন বড় হব ,নিজের পায়ে দাঁড়াব। কিন্তু মন যে বাতাসের থেকেও চঞ্চল। সেই দিন ,যেদিন আমি এই ছেলেটার কথায় এক কাপড়ে বেড়িয়ে এলাম। একই কলেজে দুজনেই পড়তাম। আমার কবি জয় আর ওর শক্তি চট্টোপাধ্যায়। আমার সঙ্গে দেখা হলেই বলত ,"মালতী বাড়ি আছো "? কী মোহ যে সেই থেকে ঢেকে ছিল ,সেই কুয়াশার জাল কেটে আজও বেড়োতে পারিনি। শুরুর দিনগুলোতে আকাশে মেঘেরা গাভীর মত চড়ে বেড়াত ,আজকে সেই মেঘেদের দেখা পায় না দুজনেই। কত কথা ছিল দুজনের রাখার ,ও কথা রাখেনি। মেঘ জমলে দুজনেই গাইতাম "আজ যেমন করে গাইছে আকাশ "--এখন মনে সবসময় ঘন নিকষ আঁধার। সকল মুখর ভাষার নীরব যন্ত্রণার ছটফটানি আজ ঝড়ের তান্ডবে তছনছ সংসারে।
বিচ্ছেদ ,বেদনা দেহ থেকে মনে ওই ধরিত্রীর সুতোতে বাঁধা পড়েছে। ধরিত্রী আমাদের মেয়ে। এই মালতী আর শক্তির একমাত্র আকর্ষণ। শক্তি নেশাড়ু কিন্তু ধরিত্রীর কাছে একান্ত ই বাবা। নেশা কাটলে বাবার আর মেয়ের স্নেহ সুরের আর বাণীর অদৃশ্য সুতোয় মেল্ বন্ধনে দিগন্ত বিলীন। ধরিত্রী জানে শক্তির নেশা ,কিন্তু বাবা যখন কবিতা বলে তখন যেন মন্ত্রমুগ্ধ। এক নাগাড়ে বলে হাউহাউ করে কেঁদে ফেলল মালতী। কথার পাকে রাত গড়িয়ে সকাল। আজ মালতী হাসপাতাল যাবে না। আজ বাড়ী যাবে সোজা।
-------চিন্তা তে রাত্রে কেও দুচোখের পাতা এক করেনি। বাড়ী পৌঁছতেই সকলের আনন্দ। সাথে আরও দুই কলেজ পড়ুয়া মেয়ে। শক্তি আজ সংযত ,কাল রাতে নেশা কাটার পরে অনুভব করেছে একা এবং একান্তের অর্থ। তাঁর অনুভবে "আমরা সকলেই যাত্রী ,ভ্রমণের চাবিকাঠি একজনের হাতে। কোথায় থামতে হবে আর গন্তব্য কোথায় সেই জানে। একলা সাথী হলে সমাজে র বড় শাস্তি ,একান্ত আশীর্বাদ এবং শান্তি আরামের। একলা ,ছটফট করায় কিন্তু একান্ত শুধুই অনুভবের। মন এ আজ মূল্যবোধ। পুলিশ ছাই এর দড়ি পাকাতেও পারে। কিন্তু সেই ছাইয়ের দড়ি পাকাতে গুটিকয়েক মানুষজন ও ওস্তাদ। নির্যাতিতা বাড়ি ফেরায় উৎসাহীর আনাগোনা বেড়েছে। আজকে শক্তি সেই আগের মতই ,বলে 'মালতী বাড়ী এসেছ ,তুমি কি আগের মতই আছ নাকি খানিক বদলেছো"। যা আছো আছো ,তুমি আমার ই আছো।
আজকের খবরের কাগজে দুই দুষ্কৃতির অপ কম্ম এবং পুলিশ হেফাজতের খবর বেরিয়েছে। নির্যাতিতার নাম পরিবর্তিত এই লেখা আছে। রূপু মুসু দের বাড়ি থেকে কথা বলেছিল মালতী বাড়িতে ।শক্তি ও মালতী বিশ্বাস করত বীজ ভালো হলে গাছ ভালো হবে। মাটির ওপর নির্ভর করে জলের স্বাদ মিষ্টি না নোনতা হবে।বীজ আর মাটির যত্নে আজ ধরিত্রী।
গাছটিতে ভালো জল ,সার দিতে হবে। ভবিষ্যতের সুন্দর ফুল ,ফলের আশায়। ধরিত্রীর স্কুলে ভূগোল শিক্ষিকা র হিমালয়ের বর্ণনা শুনতে শুনতে ধারণা তৈরী করেছিলেন ওঁর মনে। হিমালয়ের বিশালতার সামনে দাঁড়িয়ে মনে হয় এখনও অনেক চলতে হবে। ওই বিশালাকার এর সামনে আমি অতি ক্ষুদ্র। ওঁর বাবার নেশার সময় অগোছালো কথা মনকে পীড়া দিত। পীড়া দিত বসবাসের পরিবেশকে। পড়াশোনায় ভালো ,বিদ্যালয়ে আবৃত্তি ,গানে তার প্রশংসা। বাড়িতে বন্ধুরা আসতে চাইলেও ও আনেনা। বন্ধুরা যখন ওদের বাড়ির ,গাড়ির কথা বলে তখন ও শোনে। আনমনা হয়ে যায় ,ওরা বলে তোর বাড়ির কথা বল?ধরিত্রী ওর মায়ের কাছে শুনেছিলো এক হত দরিদ্র মহিলা ,যার বাড়ির চাল ফুটো ;বৃষ্টি হলে জল পড়ে ঘরে। আবার জ্যোৎস্না হলে ওই ফুটো চাল দিয়ে ঘর আলো করে। জ্যোৎসনার কথাটা মনে বড় ধরেছিল সেদিন। আজ বন্ধুদের ধরিত্রী বলে "আমার বাড়িতে জ্যোৎসনার আলো আসে প্রতি মাসে ,তোদের বাড়ি তে জ্যোৎসনা আসে ?"---
ধরিত্রীরা এ খানে থাকবে না। ওদের গন্তব্য মুসুদের বাড়ী। সেখানে একখানা ঘর বাথরুম আছে কোন ভাড়া লাগবে না। ওদের আবাসনের দেখ ভালের ভার এখন মালতীদের।