Saturday, 24 February 2018

যে জন আমার মনে 
#মৌসুমী রায় 
(৩)
তোয়া আর শীর্ষর মনের খুব মিলান্তি। দুজনেই আবৃত্তি ,গান এই নিয়েই ছুটির দিন কাটায়। দিম্মির সাথে সময় কাটে বাবা আর পয়ার কথা বলে। সু এইসব শুনতে চাইও না ,সময়ও নেই ওর। আকাশে মেঘ করলে একছুট্টে ছাদে ওরা দুজন। কখনো মেঘ ,বৃষ্টি আবার কখনো ফুল প্রজাপতি হয় ওরা। কত খেলা মনের খেলা ঘরে। খেলা কখন যেন ভালোলাগা আর ভালোবাসায় পৌঁছে গিয়েছে। বাবা চলে যাওয়ার পরে এমন করে কেউ বাসেনি। দিম্মি টের পায়। বলতে চায় ,সতর্ক করতে চায় ঠোঁটে আগল পড়ে যায়। ভয় হয় ,এবাড়ি থেকে চলে যেতে হলে কোথায় যাবে এই বয়সে নাতিকে নিয়ে। 
সু অত্যন্ত জেদি ,তেজী এবং গুণী। গান ,কবিতা পড়া ,লেখা সবেই তুখোড়। মেয়েকেও সেইভাবে তৈরী করছে।একদিন হঠাৎ সু দিম্মিকে বলে "নতুন এক হাউস কিপার রেখেছি ,তোমরা আর এখানে থাকছ না ,নতুন কাজ খুঁজে নাও "...
কোনো গন্ডগোল হয়নি ,তোয়ার যত্নআত্তি খুব করে ,সু এর সুবিধে অসুবিধে সব খেয়াল রাখে।  কেন ওরা চলে যাবে ?সু কে তোয়ার প্রশ্ন করার ক্ষমতা ,ইচ্ছে কোনটায় নেই। সেদিন দিম্মির কোলে মাথা রেখে তোয়া খুব কেঁদে ছিল। দিম্মি শুধু মাথায় হাত বোলাতে থাকল আর নিজেও চোখের জল ফেলতে লাগলো। শীর্ষ কে তোয়া আর শীর্ষ তোয়া কে ভালোবেসেছিল। ওরা চলে যাওয়ার পরথেকে আজ পর্যন্ত কোন খবর তোয়া পায়নি। কোথায় যে গেল ,কোথা হারালো কে জানে।
মিনতি পিসি তোয়াকে নিজের সন্তানের মত ভালোবাসে। সবাই তোয়াকে খুব পছন্দ করে। ওর আচার ,বিচার ,ব্যবহার বাবার মত।বাবাও ছিলেন সুপুরুষ। তোয়া ওর বাবার মত দেখতে সবাই বলে। শুদ্ধসত্য একমাত্র সন্তান হাওয়ায় কোনও তুতো কেও ছিলনা। মিনতি পিসিও খুব দুঃখী। অনাথ মেয়ে। দত্তক কন্যা হিসেবে মানুষ হন। পালিত বাবা ,মা খুব ভালোবাসতেন। তাঁদের অর্থনৈতিক অবস্থা সেরকম নয়। বয়স এর সাথে প্রকৃতির নিয়মেই তাঁদের চলে যাওয়া। মিনতি পিসি বিয়ে থা করেনি। একটা এজেন্সি তে কাজকরে। ওখানথেকেই তোয়াদের বাড়িতে পোস্টিং।
সু ওর বন্ধুর ছেলের সাথে তোয়ার বিয়ে ঠিক করেছে। যে সু এর সাথে থাকে ওর মানসিক বিকাশহীন ছেলের সাথে।
তোয়ার সঙ্গে একদিন ওর বিয়ে হয়ে যায়। শ্বশুর বাড়িতে আশীর্বাদ এ  উপহার সুসজ্জিত মোড়কে থাকলেও উপহার সামগ্রী মনগ্রাহী ছিল না।
তোয়ার স্বামীর নাম সুপ্রিয়। ও মানুষ হিসেবে খুব ভালো। সব বোঝে ,কে ভালোবাসে ,কে বাসেনা। কে অবহেলা করে ,সব সব , সমস্ত কিছু। তোয়াকে ওর খুব পছন্দ। এতেও বাড়ির অন্য সদস্য দের হাসি মজা সব কিছুই সহ্য করে তোয়া।
একটাই মিশন সুপ্রিয়র অধিকার ওকে ফিরিয়ে দেওয়া। কয়েক বছর পরে তোয়ার একটি ফুটফুটে মেয়ে হয়।
বাড়িতে তুমুল অশান্তি ,সম্পত্তির ভাগীদার এসেগেল। সুপ্রিয় মেয়ের সাথে বাচ্চাদের মত খেলাকরে। মেয়ে বড় হচ্ছে। তোয়ার বুদ্ধি টা মেয়ে পেয়েছে। সম্পত্তির ভাগাভাগি নিয়ে তুমুল অশান্তি। সুপ্রিয়র বাবা , সু কে কিছু দেবেন ,আর বাকিটা দুই ছেলের। যাই হোক সু কোনও সম্পত্তি পায়নি আইনি জটিলতায়।
তোয়া শশুরবাড়ির সম্পত্তি নিয়ে সু এর সাথেই থাকে। সুপ্রিয় বেশিদিন বাঁচবে না জেনেও সু তোয়ার বিয়ে দিয়েছিল। অর্থের লোভ আর দম্ভ এর কারণ। সুপ্রিয় আর ওর বাবার চলে যাওয়া বছর ঘোরেনি।
এখন তোয়ারা সেই ত্রিকোণমিতি। সু ,তোয়া আর  মেয়ে সমৃদ্ধা। ক্রমশঃ......







  


Friday, 23 February 2018

যে জন আমার মনে 
#মৌসুমী রায় 
(১)
দশ বছরের মেয়েটি বাবা কে জিজ্ঞেস করে "বুদ্ধ্যঙ্ক  আর মানবিক অঙ্ক অর্থ কী ?"প্রধান শিক্ষিকা বলছিলেন মেয়েরা বলো তো। বুদ্ধ্যঙ্ক  মানে অনেকে বললো আই কিউ কিন্তু মানবিক অঙ্ক সেই ভাবে অর্থ  হয়নি। তুমি  
বলে দাও বাবা। মেয়ে স্বচ্ছতোয়ার প্রশ্নে বাবা শুদ্ধসত্য জেরবার। মেয়ের বাড়ি ফিরে সময় চলে একরত্তি বোন পয়মন্তি র নানান অভিব্যক্তির অর্থ কি হবে তার গবেষণা ,নিজের পড়াশোনা আর বাবা বাড়ি ফিরলে সব প্রশ্নের সমাধান বাবার মস্তিষ্কের  প্রযুক্তি বিদ্যায়। ওরা তিনজন খুব খুশি থাকে যখন শুধুই তিন থাকে। বাবা মেয়েকে বলতেন আমরা জ্যামিতির একটা চরিত্র জানিস তোয়া। তুই ,পয়া আর আমি। আমরা ত্রিকোণমিতি ,আমাদের বাড়িটা পিরামিড। আমরা "মমি "বলেই হাততালি আর হাসির ফোয়ারা ,সেই দেখে দু বছরের পয়া ও তাল দেয়। ও যেন কত বোঝে। 
শুদ্ধসত্য বই এর  ব্যবসা করেন। রাত্রে তোয়া খাবার খেয়ে ঘুমোয় না। একজন হাউস কিপার আছেন তিনি বাড়ির সব কাজ কম্ম করেন ,বাজার ঘাট ,ডাক্তার ,ওষুধ  পয়া কে দেখা শোনাও সমস্ত। 
তোয়া প্রতি রাত্রে বাবার কাছে গল্প শুনবে তবে ঘুমোবে। কত রকমের গল্প। আজ আবার একটা প্রশ্নও আছে। দরজার ঘন্টা টা আজ বাজছেই না। ধুর ভালো লাগেনা  "বাবা যে কেন দেরী করে ?"অমনি দরজায় ঘন্টা। বাবা এলো। হাতমুখ ধুয়ে খাবার খেয়ে বাবা গল্প শুরু করবে কিন্তু আজ প্রশ্ন টা আছে ,ওটা জেনে তবে গল্প। 

বাবা বললেন বুদ্ধি টা ঠিকই আছে। মানবিক অঙ্ক হল এক বিশাল পৃথিবীর সদস্য হওয়া। পড়াশোনার সাথে সাথে নিজেকে তৈরী করা। আমাদের দেহে পঞ্চ রস আছে। ক্ষিতি ,অপ ,তেজ ,মরুৎ আর ব্যোম। ব্যোম ব্যোম ভোলে হা ,হা ,হা।বড় হতে হতে বাতাস ,জল ,আগুন , মাটির  আস্বাদ নিতে হবে। জল খাবার সময় জলের স্বাদ নিতে হবে। যোগ ব্যায়াম করতে হবে। দেহের সাথে মনের শুদ্ধিকরণ হবে। দুইয়ের মেলবন্ধনে গড়ে উঠবে মানবিকতা। যে অন্যের পাশে দাঁড়াতে শেখাবে মানুষকে। অসহায়ের সহায় হবে ,অনাথের নাথ হবে। উপকার করার চেষ্টা করবে। প্রকৃত মানুষ হবে। বুদ্ধি, মন দুয়ের মিলনে হয় মানবিক অঙ্ক।
(২)
রোজনামচা  বাপ্ ,বেটিদের। কত গল্প বাবা মেয়েদের বলে তার শেষ নেই। কখন কখন বাবা শুধায় তোরা কার ছানা ,বিড়ালের না বাঁদরের। তোয়া বলে কেন আমরা মানুষের ছানা ,ওদের হব কেন। বাবা বলে শোন তবে একখানা গল্প বলি। মানুষের ছানাদের ও এই দুই প্রবৃত্তি হয়। এই যেমন বাঁদরের ছানাদের জীবনের ঝুঁকি আছে বিস্তর। বাঁদর এ ডাল ,ও গাছ দৌড় ঝাঁপ করে ,তার বাচ্চা বাঁদরের পেটটা শক্ত ভাবে ধরে থাকে ,নচেৎ পড়ে গিয়ে হাড় ভাঙবে নয়ত মৃত্যু।
আর বিড়াল মা তার ছানা গুলো র ঘাড়ের কাছটা কামড়ে ধরে বাড়ির নিরাপদ জায়গায় রেখে দেয়। বাড়ির মানুষেরাও তাদের দেখভাল করে কখন সখন। জীবনের ঝুঁকি অনেক কম। তোয়া বলে আমাদের জীবন বাঁদরের হতে হতে আপাতত বিড়ালের হয়েছে। বাবা মুচকি হাসেন। কি বল ,আমরা কলমি শাকের দল। একটা টানলেই গোছা শুদ্ধ হাজির। কিছু না বুঝেই পয়ার হাত তালি।
তোয়ার  বয়স আঠেরো। সে আজ একা ,কত কথা ,গল্প ,বাবা ,পয়া সব মনে পড়ে। সেইদিন বাবার বাড়ি আসতে খুব দেরী হয়েছিল। আষাঢ়ের কালো মেঘে বৃষ্টি এসে ছিল ,থামার নাম গন্ধ নেই। পয়ার ধুম জ্বর কিছু তেই কমে না। ডাক্তার ও আসছে না। মা কে পাওয়া যাবে না। প্রতিদিন তার পার্টি ,খানাপিনা। নামি দামি লোকজনের সাথে ওঠা বসা। আজ বাবা প্রায় তিন থেকে চার ঘন্টা দেরি তে বাড়ি এল। ততক্ষনে পয়া নেতিয়ে পড়েছে। ডাক্তার এলেন ,জবাব দিলেন। সেইদিন ত্রিকোণমিতির একটি কোণ ভেঙে গেল। দিনযায় ,রাত যায় তোয়ার পয়ার সেই ছোট্ট বেলার শুয়ে থাকা,হাত ,পা নড়ান সব মনে পড়ে। ঘুমের মাঝেও ঠোঁটের কোণে হাসি থাকত। ও সেভাবে মাকে পায়নি। তোয়াও ।
চিৎ হয়ে শুয়ে আকাশ দেখতো ,না বশে থাকা হাত দুটো দিয়ে সব কিছু পেতে চাইত। মুঠি করা হাতদুটি তোয়া খুলে দেওয়ার চেষ্টা চালাত ,কিন্তু আবার মুঠি হয়ে যেত। মুঠি হাতে কতকিছু দিতে চাইত। কালে ভদ্রে মা গালটা টিপে দিত।
তোয়া আর পয়া মা কে কোনদিন মা বলেনি। তোয়া এখনও। ওকে" সু "বলতে হত। সুচরিতার সু।  মা ডাক ওর পছন্দ নয়। বাড়িতে মাঝে মাঝে একটা লোক আসত। ও ,পয়া আর তোয়া কে  চকলেট দিত। ইদানিং আর দেয় না। তোয়া এখন চকলেট চাইও না।  পয়া চলে যাওয়ার পরে পরে খুব ঘনঘন আসে। তোয়া পছন্দ করেনা। বাবার মত শান্ত মানুষ ওকে দেখে কেমন বদলে যেত। ওই লোকটার সামনেই বাবাকে সু যা নয় তাই বলত। দিনদিন বাবা কেমন হয়েযেতে লাগল। পয়া যখন বারো বছর ,হঠাৎ বাবার বমি পায়খানা আর থামে না। ডাক্তার ও বাবাকে দেখে বললেন খাবারে বিষাক্ত কিছু মিশেছিল সেই খেয়ে এমন হয়েছে ,করার কিছুনেই। সবশেষ হয়ে যাবার পরে সু আর ওই লোকটা এসে ছিল।
কয়েকদিন পর ওই হাউস কিপার কে ছুটি দিয়ে দেওয়া হল। বাড়িতে এলো একদিম্মি আর তার অনাথ বছর চোদ্দোর নাতি । সু প্রথমে আপত্তি করেছিল নাতি আসাতে। কিন্তু দিম্মি অনড়। তাই সম্মতি। ওর নাম শীর্ষ। সু একটা স্কুলে শীর্ষ কে ভর্তি করল।  শনি রবি তোয়া বাড়িথাকে। কবিতা শেখে। শীর্ষ আড়াল থেকে দেখে ,শোনে।
সু আর ওই লোকটা এখানেই থাকে। লোকটার অনেক অর্থ,সম্পত্তি । ওর অন্য বাড়িতে দুটি ছেলে আছে। একটি সাধারণ , বাবার ব্যবসা দেখে। ছোট টার মনের বিকাশ পূর্ণতা পায়নি।ক্রমশঃ ....













Sunday, 28 January 2018

দুই বিনুনী 
#মৌসুমী রায় 
এই সেদিনের মেয়ে ,আজ বয়স বারো  হলো। সরস্বতী পুজোয় ওর নাচের অনুষ্ঠান  হবে বাড়িতে এবং স্কুলে ,সাথে গান ও গাইবে মেয়েটি । তোড়জোড় শুরু ,পুজোর  সামগ্রীর সাথে সাথে ঠাকুর আসবে বাড়িতে। সেই ছোট্ট মেয়ে আজ শাড়ি পড়বে। বসন্ত পঞ্চমীর  শুক্ল পক্ষে, আদরের বাড়ির ছোট্ট সরস্বতী। বাসন্তী রঙে লাল পেড়ে শাড়ি ,কপালে সাদা রঙের  কলকা এঁকে গোল টিপ্ লাল রঙের  আর তার সাথে দুই বিনুনি খেজুর ছড়ি শৈলীতে বাঁধা। সেটিকে বেড়া বিনুনী বেঁধে পলাশ  মালা জড়ানো থাকবে। কানে পলাশের দুল ,হাতে পলাশের বালা ,আর নাকে পলাশের বেসর এবং গলায় পলাশের মালিকা। বাজু বন্ধনী আর কোমর বন্ধনীও পলাশ মালিকায়।  এই বেশ ভূষণ  সজ্জা  পরিকল্পনা মেয়েটির দাদুর। আর কপালে টিকলি থাকবে ,সেটাও ওই পলাশের। 

কয়েক দিন ধরেই চলছে রিহার্সাল বাড়িতে। মধুর মধুর ধ্বনি আর আজি কমল মুকুল দল খুলিলো  গানের সাথে নাচ  অনুশীলন। মাঝে মাঝে দাদু নাতনিকে নাচের ভঙ্গিমাও দেখাচ্ছেন। কমল মুকুল দল খুলিল গানের কথায় দুটি হাত ঘুরিয়ে প্রথমে কুঁড়ি মুদ্রায় এনে ফুটিয়ে তোলার মুদ্রা আনতে হবে।মধুর মধুর ধ্বনিতে বীণা বাদন ভঙ্গীতে নৃত্য প্রদর্শন।   বলে রাখি দাদু নাচের কিছুই জানেন না। কিন্তু রবি ঠাকুর তাঁর প্রিয়। সুতরাং নাচটাও তাঁর মনে হয় নাতনী এই ভাবে নাচলে বুঝি সুন্দর প্রদর্শন হবে। প্রায় ঘন্টা খানেক নাচের অভ্যাস চলত। আর গান এর অভ্যাস  ও চলত ঘন্টা খানেক। সঙ্গত করতো মেয়েটির কাকা। তিনি ভালো তবলা বাজাতেন। লোকে মন্ত্র মুগ্ধ হয়ে শুনতো। আরও একটি গুণ তাঁর অপূর্ব যাত্রাভিনয়। মঞ্চে উঠলে সবাই তাঁকেই দেখতেন। যেমন তাঁর বাচন ভঙ্গী তেমন স্পষ্ট উচ্চারণ। হ্যাঁ ,ওইযে বলছিলাম গানের সঙ্গত করার সময় কাকার তবলার বোলে শেষ তেহাই টা আজও মেয়েটার স্মৃতিতে। মেয়েটি তাঁর দাদু এবং কাকার তালিমে বেশ দক্ষ হয়ে উঠেছে।  এভাবেই অনুশীলন চলত। থেকে থেকে আনন্দে বলতেন দাদু ,আসলের চেয়ে সুদ মিষ্টি একেই বলে বুঝলে নাতনী। তুমি আমার সংসারে হঠাৎ ভেসে আসা ধন নও ,তুমি আমার অন্তরের অন্তহীন ভালোবাসার ধন। বলেই একটা চারমিনার সিগারেট ধরাতেন ,আর সুখটান দিতেন। একেবারে সিগারেটের শেষ টান অব্দি টানতেন। বাম হাতের মধ্যমা আর তর্জনী উপরের কর দুটি তামাক রঙে রাঙানো।
দাদুর একটা বেগুন ,এই সিগারেট পান করা। বাড়ির নিষেধ শুনতেন না। ছোট্ট নাতনী তখন জানত না এটা ভাল নয় শরীরের পক্ষে।  

মাস খানেক ধরে চলত কঠোর অনুশীলন ,গলার জন্য চলত কসরত। গার্গেল করা ,নীচু স্কেল এ ওম উচ্চারণ আর গলা সাধা।  আচার বা টক জাতীয় কিছু খাওয়া যাবেনা। ঠান্ডা লাগানো যাবেনা ইত্যাদি ইত্যাদি। অনেকে এই নিয়ে হাসাহাসি করত আড়ালে। মাঝে মাঝে এ ভাবেই চলত  দাদুর দেখভাল আর পরামর্শ। রবিঠাকুরের গানের সঞ্চারী তে নৃত্যের ভঙ্গিমা কেমন হবে। সঞ্চারী কিন্তু গানের মর্ম কথা ও সুরের অপূর্ব মেল্ বন্ধন ,নাচ টা সেই ভাবে পরিবেশন করতে হবে। মাঝে মধ্যে চলছে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কবিতা আবৃত্তি। অন্য সদস্যদের পরিবেশন। সেখানেও দাদুর অনুশীলন। কোথায় কোথায় গলার ওঠা নামা ,গম্ভীর এবং স্পষ্ট উচ্চারণ।
থেকে থেকে সাজসজ্জার কথা উঠলেই বার কয়েক নাতনীর দুই বিনুনী আর পলাশের মালার পুনরাবৃত্তি।এর আয়োজনে ত্রুটি না হয়। হলেই কেলেঙ্কারি ,একেবারে যাকে বলে দক্ষ যজ্ঞ।

পরিবারে কর্তার আনন্দ আর সদস্যদের আনন্দের যৌথ কলস পূর্ণতা লাভ করলো। আনন্দ ধ্বনির প্রতিধ্বনিতে উপচিয়ে পড়ছে খুশী। খুশী গুলী কত আল্পনায় পথ এঁকেছে। গন্ধের ম ম ,বসন্তের বাতাসের মত বইছে। আজকের মতো খুশী দাদুকে কখনও দেখেনি বাড়ির সদস্যরা। আজ সত্তরের দাদু যেন সাতাশের প্রাণোচ্ছল যুবক। খাওয়া দাওয়ার ব্যবস্থা ,শীতল ষষ্ঠীর কলায় সেদ্ধ ,সব মিলিয়ে এক উৎসব বটে।
স্কুলের অনুষ্ঠান পুজোর দিন। সেদিনের দুই বিনুনী বাঁধা ,ফুলের সাজ সেটাও দাদুর দেখভালে। ওই অনুষ্ঠানে সকলে খুব খুশী। তার সাথে প্রশংসা চুলের প্রসাধনের। পরের দিন বাড়িতে অনুষ্ঠান ,অনেকে উপস্থিত। সকল সদস্যদের অনুষ্ঠান পরিবেশন এবং তাঁর প্রিয় নাতনীর নৃত্যানুষ্ঠান।বিনুনী মেয়েটির মা যত্নে বেঁধে ছেন। ছোট্ট পায়ে আলতা পড়েছে। হাতেও আলতার আঁকিবুকি। বেশ লাগছে মেয়েটিকে। একেবারে বিয়েতে কনের সাজে। ঠাকুমা ,মা ,কাকীমা কনিষ্ঠা র নখে দাঁত ঠেকিয়ে কি সব করল। নজর না লাগে।
দুই বিনুনী খুব শক্ত ভাবে বন্ধনে আবদ্ধ ;আর ফুলের মালারও অটুট বন্ধন। দাদু খুশী। নাতনী তাঁর মনের মত অনুষ্ঠান সম্পন্ন করেছে।
অনুষ্ঠান শেষে দাদু কিছু কথা পরিবেশন করেন। তিনি বলেন ,"দেখা না দেখার মাঝে কতই স্মৃতি সুধা ,আজকে নগদ কালকে ধারের সুখের সুতোয় বাঁধা। বারে বারে বাঁধব তোমায় জনম জনম ধরে ,হাসি খুশী থেকো সবাই শুধুই যোগের ঘরে। থাকবনা যখন আমি দেখবে নতুন সূর্য নতুন ভোর ,এই আশাতেই ভরুক ভাবনা মোর। ভালোবেসো সকল জনে মনে প্রাণে ,কর্মে মৃত্যুঞ্জয়ী হোক তোমার আমার ভালোবাসার টানে ".....
বলেই দাদু  চোখ দুটি অঝোরে বইতে লাগল অশ্রু নদী। স্তব্ধ সবাই কেও করতালি দিতে গিয়েও পারলনা।
ধাতস্থ হয়ে দাদু আবার বলে গেলেন তাঁর বাড়ির এতো দিনের পরিশ্রমের কথা। আর বললেন এই দুই বিনুনী বাঁধা নাতনীর কথা। অনেক দিনের সাধ ছিল বাড়িতে এক কন্যা সন্তানের আগমন। নাতনী সেই বাসনা পূর্ণ করেছে।
এক প্রত্যন্ত গ্রামের দাদু নাতনীর যুগলবন্দী গ্রামবাসীদের আনন্দ দিয়ে ছিল সেইদিন। মন্ত্র মুগ্দ্ধ অনুষ্ঠানের পর সকল গ্রামবাসীর মুখে মুখে ধ্বনিত , পরিবারে মেয়েদের সৌন্দর্য  ই আলাদা। মনে মনে প্রত্যেক পরিবার দুই বিনুনী বাঁধা মেয়েটির শুভ কামনার সাথে তাঁদের পরিবারে কন্যা সন্তানের আগমনের কামনা ও জানিয়েছিল। 

  

Tuesday, 9 January 2018

নববর্ষ 
#মৌসুমী রায় 
পদ্মাসনে স্বাগত নববর্ষ ,তুমি তোমার তরঙ্গ কল কল্লোলে। 
ক্ষুদ্র চাওয়া পাওয়ার উর্দ্ধে আজ সকল হৃদয় দোদুল দোলে।।

বছর ভরে ,স্তরে স্তরে আশা আকাঙ্খায় যতনে সাজানো ঝাঁপি। 
বে -হিসেবি ,পূর্ণ -অপূর্ণের ডালি অংকে রাখেনি মাপি।।

এস বন্ধু হয়ে ,নম্র বয়ানে আমার নত নয়নের কোলে পৃথিবী পরে। 
যা কিছু হারিয়েছি জানি সে পূর্ণ হবেনা এ ভবের সংসারে।। 

তবুও হে অনন্ত নিখিল তোমার ভালোবাসা রাখার আধার অফুরন্ত। 
দুখের মাঝেও চিনি যেন তোমার সুখের  বিশালতার  অনন্ত।। 

হে সুন্দর নিয়ত নব রূপে এস মনের কোণের হৃদয় আসনে। 
দিন রাত্রি যাপন করি নববর্ষ রূপে দেহে লালনে  মনে যতনে।।   

সময় হয়েছে মানবজাতির নববর্ষ কে বাঁধতে নতুন অঙ্গীকারে। 
শত অবাঞ্ছিতের মাঝেও আমরা দিয়ে যাব  নবীন বসতি আগামীরে।।  

Thursday, 4 January 2018

পৌষাললো 
#মৌসুমী রায়
বীরভূমের মেয়ে হওয়ার সুবাদে  বীরভূমের অনেক টুকরো স্মৃতি আজও স্মৃতিপটে। বোধকরি শীতের স্মৃতি একটু বেশিই টাটকা। আমাদের গ্রামের বাড়ি একান্নবর্তী। শীতের ছুটিতে খুড়তুতো ,পিসতুতো ভাইবোনদের সমাগম। আমার বাবা বড় ছিলেন তাই জেঠতুতো কেও ছিল না। শীতের আমেজে এমনই টাটকা হতাম যে বিদ্যালয়ের ছুটি পেরিয়ে গেলেও কোনো হেলদোল থাকত না। যে এবারে শহরে ফিরতে হবে ,আবার নতুন ভাবে সব শুরু করতে হবে ইত্যাদি ইত্যাদি। ফেরার সময় দাদু ,ঠাকুমা ,বড়মার জন্য মন খারাপ  করত। ও হ্যাঁ বড়মা আমার দাদুর মা। ফেরার দিন গরুর গাড়িতে করে বাস স্ট্যান্ড আসতে হত তখন। ফিরে  আসার দিন দাদু সদর দরজায় চুপ করে বসে থাকতেন। অন্য দিনের মতো হাঁক ডাক নেই তাঁর। বড়মা আমাদের বাড়ির আমতলায় চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকতেন। গরুর গাড়িতে যাওয়ার সময় গাড়িথেকে যতদূর দেখাযায় সে আমার ঠাকুমার চোখের জলে ভেজা মুখখানা। খুব মন খারাপ আমাদেরও। আরও মনে আছে গ্রামের বাড়িথেকে যে জামাকাপড় গুলো আনতাম তার গন্ধ শুঁকতাম। আর বাড়ির গন্ধ পেতাম। 

হ্যাঁ ওই যে বলছিলাম শীতের কথা। সে বেশ লাগত জানো। ভোরের সূর্য আলো দেওয়ার আগে আমাদের বাড়ির কাজ করত গোবর্ধন কাকা মাটির হাঁড়িতে করে ধোঁয়া ওঠা খেজুরের রস নিয়ে আসত। আশ মিটিয়ে খাওয়া হত। যতদিন শীতের ছুটি ততদিন ওই খেজুর রস। আহা কি মিষ্টি ,কি সুস্বাদু কি বলব। 
খানিক বাদে রোদ উঠতেই কাঠের উনুনের আঙ্গারে কালো কালো বেগুন পুড়িয়ে ভালো করে সর্ষের তেল ,কাঁচালঙ্কা ,পেঁয়াজ দিয়ে মেখে বেগুনপোড়া আর মুড়ি খাওয়া। তখন জল খাবারে রুটি ভাবাই যেতনা।
তার উপর পিঠে ,পুলি তো ছিলই। সেই পিঠের চাল গুঁড়ো হত ঢেঁকিতে।ঢেঁকি পাড় দেওয়াও যেন কি মজার। আর একজন ঢেঁকির পাড়ের তালেতালে চালগুলোকে ইস্পাতের পাত দিয়ে ঘেরা গর্তে  হাত ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে ওলট পালট করতেন। সেও এক শিল্প না দেখলে বোঝা যাবেনা। তালে তালে হাত না ঘোরালে   হাত কেটে একেবারে ফালাফালা হয়ে যাবে। ঢেঁকি পাড়ের সাথে সাথে চলত বীরভূমের মাটির গান।

এছাড়াও আরও একটি শীতের আনন্দ পৌষাললো। পৌষ মাসের বনভোজন। পৌষের মিঠে কড়া রোদ মেখে নতুন ধানের চালের ভাত ,শীতের সবজি আর হাঁসের ডিমের ঝোল খাওয়া। বাড়িথেকেই সব জিনিসপত্র নিয়ে গিয়ে গ্রামের শেষ প্রান্তে কেটে নেওয়া ধানক্ষেতে রান্না বান্না করা হতো । আর হ্যাঁ রান্না করার পূর্বে যে উনুন তৈরী হতো তার পাশেই মাটিদিয়ে একটা লাফিং বুদ্ধর মত দেখতে মূর্তি গড়া হতো। সেটি আসলে ভৈরব মূর্তি। আগুন জ্বালানোর পূর্বে আনাজপাতি সব উৎসর্গ করা হতো। নির্বিঘ্নে পৌষাললো সম্পন্ন করার তাগিদে। কোনও জৌলুস ছিলোনা। ছিল মনের তৃপ্তি। সূর্য ডোবার পূর্বে বাড়ি ফেরা। আজকের দিনে গ্রামের বাড়ির স্মৃতি হাতড়ে মরি। হাজার বার চাইলেও ফিরে পাবনা সেই দিনের শীতের আনন্দের অনুভূতি। 

  

Wednesday, 27 December 2017

 প্রিয় আমার্ 
#মৌসুমী রায় 
মনে এলো কতক কতক কথা ক্ষণেক স্মৃতির ঘরে।তোর আসার অনুভূতি ,
আমার শরীর জুড়ে। এক পলকে বিদ্যুৎ ঝলকে রূপালি আলোকে ,
জমা মেঘের বৃষ্টিধারায়, রাতের জোছনা আভার  উঁকি অন্তরে,
সুখের ঘরের আভাস ঘিরে। 
শুধালে ছুঁয়ে যাওয়া মনের গভীর খাদে ,প্রতিধ্বনি হলো মনের কিনারে। 
প্রশ্নে প্রশ্ন সাজানো মনে মনে  অনেক ভাষার ভাসা ভাসা   অভিজ্ঞতা,
টলমল পায়ে চলার আকুলতা ,সুখে দুখে ,থাকব সাথে।
অঙ্গীকার নয় ,এশুধুই ভালোবাসা , বাঁধা নয় অলস মায়া ডোরে ।

কত কত কথা   বইল মিষ্টি  হাওয়ার বদান্যতা আর ব্যাকুলতায়।
ঝাপসা দেখার আঁধার রাতের চাঁদের জোছনায় ভাসলো ভাষার বন্যা।
ফাল্গুনের পূর্ণিমা রাতে নদীর কিনারায় নৌকা বাঁধা ঘাটের পানে চেয়ে থাকা।
কোথাও কিছু কম পড়েনি ,কানায় কানায় ভরে থাকা মুগ্ধতা।

অল্প আলোয় অবুঝ শিশুর কথা   যখন  ভাবে মন ,কিন্তু বলে মুখ।
ঘন যামিনীর মাঝে নাদেখা কে দেখা ,অচেনা কে চেনার অব্যক্ত ভাষা।
সৃষ্টিকালের মাটির তাল এখন এক মহীরুহ হওয়ার পথে। তবুও অনন্ত অশান্ত মন।
শুভ কামনা ,যত হকের আশীর্বাদ যেন ওই সৃষ্টির গোড়ায় ঢালে উদারতা ।

এটাই শুধুই অন্তরের অন্তঃস্থলের বাসনা ,কামনা। যদি ভালো কিছু হয়ে থাকে।
হকের সমস্ত আশীষ টুকু নিঃশেষে সৃষ্টির উপর বর্ষায়।

ভালো থাকার আশীর্বাদ চেয়ে নেওয়ার চোখ আকাশ পানে চায়।
হয়ত খুবই ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অনুভূতি ,মনে জাগে এভারেস্ট লঙ্ঘনের প্রাপ্তি।

নিজের ভালোলাগা কখন যেন প্রিয়জনের  ভালোলাগা ,ভালোবাসায় রূপান্তর ঘটে।
আজও সেই  সময় ,ক্ষণ অচেনা ,অজানা  এক আবিষ্কার। এতে নিজের অধিকার ,
এর ফলাফল সুদূর প্রসারী বহন বার্তায় । 

ওই যে  তারায় তারায় ভরা  আকাশ মাঝে  সূয্যি চাঁদের যুগল ক্ষেত্র । 
কামনায়ওঁদের মত মুক্ত মনের হলে ই অন্ধকার হবে আলো। আঁধারে জ্বলজ্বল করবে স্বাতী ,
অরুন্ধতী ,ধ্রুবতারা সবের কাণ্ডারী ।

অল্প নিয়ে থাকার আকাঙ্খায় বৃহত্তর পথের অতিক্রমের আশা।
 সকল ক্ষণের সাথে অবস্থান।সে যে আঁধারে আলোর চাদর পেতেছে।
প্রখর তাপের পরে এক পশলা বৃষ্টি ,আহা সে স্মৃতি আজ গভীর শ্বাসের তৃপ্তি মাঝে।
স্ন্হের পরশে ,পূর্ণ আবেশে পরম প্রাপ্তি আলোর দিশারী।      

Wednesday, 18 October 2017

পূর্ণিমা 
# মৌসুমী রায় 
বীরভূম জেলার প্রত্যন্ত গ্রাম  এ ভুজঙ্গ ভূষণ সেন শর্মার নিজ গৃহে কালী পূজার প্রস্তুতি চলত দুর্গাপুজোর দশমীর পরের দিন থেকে। কারণ পুকুর ঘাট থেকে এঁটেল মাটি তুলে এনে শখানেক প্রদীপ গড়তে হত ,শুকোতে দিতে হতো , এমনকি আগুনে পুড়িয়ে একেবারে শক্ত পোক্ত করে একটা বাঁশের ছিলা দিয়ে বানানো ঝুড়ি তে ভরে চিলেকোঠার ছোট্ট ঘরে এককোনে রেখে দেওয়াহত ,বাচ্চাদের নাগালের বাইরে।  প্রদীপের সর্ষের    তেল থেকে সলতে সব কিছুই বাড়ির তৈরী  ; জমির সর্ষে পিষিয়ে তেল হত ,বাড়িতে কার্পাস তুলোর গাছ আবার শিমুল তুলোরও। কাপাস তুলোর সলতে পাকানো হতো । গিন্নিমারা  দুপুরে খাওয়াদাওয়া সেরে ছালের কাপড়পড়ে সলতে পাকাতেন। সে এক ধুম বটে বাড়িতে। ওই সব দেখতে গিয়ে পড়াশোনা মাথায় উঠতো আরকি। পড়তেও হত পুজোর ছুটির পরে পরে ক্লাসে ওঠার পরীক্ষা। কি রাগ হতো কী বলব। সব রাগ পড়ত ওই বিদ্যা সাগর মহাশয়ের ওপর। 

সমস্ত কাজ নিপুণহাতে সম্পন্ন করত ওই বাড়ির পরিচারিকা সুষমা মুর্মু আর ওর মেয়ে পুন্নুমা ছাড়াও আরও একজন ওই বাড়ির মেয়ে শ্রমণার ছোটবেলার বন্ধু শামীম। পুন্নুমার নাম পূর্ণিমা কিন্তু ওর বাড়ির সবাই পুন্নিমা আর পুন্নুমা বলেই ডাকত ,  এবাড়ির সকলে পূর্ণিমা বলে। পূর্ণিমার গায়ের রং শ্যামলা ,চোখদুটো উজ্বল সবসময় যেন কথা বলে ;আর নাক টা চাপা হলেও ওকে কৃষ্ণকলি অনায়াসে বলা যাই ;সুষমা পিসির তাতে সাই নেই ,সুতরাং ওকে পুন্নুমা ডাকতে হবে। আর শামীম ? শ্রমণা দের   গাঁয়ের ,পাশের গাঁয়ে থাকে ,ছোটবেলা থেকে এবাড়িতে ওর আব্বু হাকিম শেখের সাথে আসত ,সেইথেকে শ্রমণারা তিন বন্ধু। হাকিম চাচা আবার ভুশুনসেনের সর্বক্ষণের বিশ্বস্ত সঙ্গী। ভুজঙ্গ ভূষণ কে সকলে ভুশুনসেন নামেই ডাকতেন ,ও হ্যাঁ সেন মহাশয় তাঁর নামে ধারে ভারে কাটেন ;তিনি যা বলবেন তাই হবে এই কথা সকলের জানা। 

 প্রথম প্রথম বাড়ির গিন্নিমার  ছোঁয়াছুঁয়ি ,এটা ধরবেনা ,ওটা নাড়বেনা গোছের শুচি বায়ু চাগাড় দিত। এমনকী কলাইকরা সানকি থালায় ওঁদের খেতে দিতেন ,সিমেন্ট বাঁধানো মেঝের এঁটো শুকরি গোবর দিয়ে ধুতে বলতেন ;বাড়ির খিড়কি দরজা থেকে সদর সমস্ত টা ই গোবর জলের লেপন থাকত। পাকা বাড়ির সর্বত্র গোবর এর গন্ধে তিষ্ঠোনো যেতনা।  সেন  বাড়িতে কত লোকজন আসতেন , প্রথম অভ্যর্থনা হতো এক কাঁসার ডিস্ এ গুড়ের বাতাসা আর কাঁসার ঘটিতে জল ; কাঁসার গেলাসে ও  জল টলটল করত, এমনকি গেলাসটি এমন চকচক করতো যে মুখ দেখা যেত। তাহলে হবে কি একচুমুক দিলেই গোবর গোবর গন্ধ। লোকজন বাতাসা খেয়েই তুষ্ট হতেন তেষ্টায় ছাতি ফাটলেও জলমুখো হতেননা। 
এসব ভুশুনসেনের নজর এড়াতনা , তাই গোয়ালঘরের গোবর ওই গোয়াল পর্যন্ত রইল ,বাড়ির অন্দরমহলে প্রবেশ নিষিদ্ধ হল।
কালীপুজোর আগে যখন শ্রমণারা তিনবন্ধু ছোটছিল তখন সুষমা পিসি সব করত। মানে প্রদীপ তৈরী করা থেকে শুকানো ,শুকনো প্রদীপ চিলেকোঠা থেকে নামানো। সব পরিশ্রমের কাজ সুষমা পিসির ,আর গিন্নিমাদের কাজ  সেই প্রদীপ জ্বালিয়ে মন্দিরে মন্দিরে দেওয়া ,খিড়কি থেকে সদর পর্যন্ত  পুত্র বধূরা সাজাতেন। প্রদীপ জ্বালানোতে সুষমার ছোঁয়া অশুচি হবে। 
এমনই এক কালীপুজোর আগের রাত্রে ভূতচতুর্দশী তে পুর্ণিমা বলে  দাদামশাই,এ কেমন রীতি গো তোমাদের ;আমরা সাঁওতাল বটি ,নীচু জাত কিন্তু চোদ্দ শাক তুলে আনি ,প্রদীপ গড়ি ,তোমাদের খাবার জল আনি। কিন্তু মন্দিরে উঠে দীপাবলির দিনে দীপ জ্বালাতে পারিনা। কেননা আমরা নীচু জাত। আবার শামীম দিদি , আমি  শ্রমণা দিদি একসাথে খেলাকরি ,স্কুলে যাই সেখানে স্যার ,দিদিমণিরা তফাৎ পড়ান না। তাহলে শামীমদিদি ,আমি ,আমার মা কেন দীপ জ্বালাবোনা বলতে পারো ? অঝোরে পূর্ণিমার দুই গাল অশ্রুধারায় সিক্ত ,সিক্ত ঠোঁট দুটি প্রতিবাদের ভাষায় কাঁপছে। 
আজ প্রতিবাদ ভাষার সার্থক জন্ম লাভ করেছে ,সবাই স্তব্ধ সুঁচ পড়লে তার শব্দ ও যেন অনুরণন সৃষ্টি করবে। 

এখনও থামেনি পূর্ণিমা বলেই চলেছে অবহেলা ,অনুকম্পা ,অশ্রদ্ধার ,বঞ্চনার কথা। 
মাকালী ?সেওতো এক মেয়ে ; তোমরা  জানো এই দেবী কোন জাতের ?তোমরা ভয়ে পুজো করো ,শ্রদ্ধা নেই তোমাদের। কালীও মেয়ে আমরাও মেয়ে। আমাদের অপমান মাকালী র অপমান। আগে নিজের ঘরের কালীমাতা কে সম্মান দাও। উঁচু জাত ,নিচুজাতের দোহাই দিও না। পরিশ্রমের ভাগ নীচু জাতের আর ফলাফলের ভাগ তোমাদের। 
কান্না তখন আর্তনাদের ভাষায়। 
রাশভারী ভুজঙ্গ ভূষণ সেনের  আনুমানিক পাঁচকিলো গ্রাম ওজনের হাত টি স্নেহের পরশ নিয়ে পূর্ণিমার মাথায় যেন সুরক্ষার ছাতা ; রোদ ,বৃষ্টি থেকে দুর্যোগ থেকে রক্ষা করলো। তিনি  বাজখাই কণ্ঠস্বরে গলা টা খাঁকড়িয়ে হুঙ্কার দেন। 
আজ দীপাবলি সবাই খুশির আলোতে এস।
 বড় বড় মাটির সরাতে একশত প্রদীপ সাজিয়ে জ্বালানো হল। পূর্ণিমা ,শামীম ,শ্রমণারা ,বাড়ির বাচ্চারা গোটা বাড়িতে আলোর বন্যা বইয়ে দিলো। মন্দিরে মন্দিরে প্রদীপ জ্বালালো। পুরোনো সেই শিবতলা , যেখানে শ্রমণারা  জ্বালানো প্রদীপের থালা ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে সকলে গাইত "আলোর ডালায় বরণ  করি মাগো ,  সকাল সাঁঝে মনের ঘরে জাগো। " আজ সুষমা পিসি ,  শামীম, পূর্ণিমারাও গাইছে ,দীপাবলির রাতে মনের আলোগুলো জ্বালাচ্ছে। 

ওঁদের এখন অনেক বয়স হয়েছে ঠাকুমা ,দিদিমা হয়েছে। যে যেখানে থাকুকনা কেন , এখনো কালীপুজোয় পূর্ণিমারা একসাথে নিজের গ্রামে যায় ,প্রদীপ জ্বালায়  ,গান গায় কাঁপাকাঁপা গলায়।  শ্রমণার পাঁচ ভাই কে ভাইফোঁটা দেয়।  সারা বছরে সুস্থতা কামনা করে ওরা সকলের।   পরের বছর আবার আসব এই আশায়  আশায় থাকে।