Wednesday, 24 May 2017

বড়মা 
পর্ব -দুই 
পত্নী বিয়োগ চিন্তার সাগর এ ভাসছেন  কবরেজ মশায়। ইতিমধ্যে রুগী দেখার ডাক এসেছে বর্ধমান জেলার মাদারবাটি থেকে। বোনের কাছে সদ্য মাতৃহারা ছেলেকে বুঝিয়েসুঝিয়ে রেখে গেলেন। স্বাস্থ্য পরিষেবা তাঁর জীবনের মন্ত্র।বেশিরভাগটাই তাঁর বীনাপারিশ্রমিকের।তাঁর নামের জয়গান করেন লোকজন।  বিপদ -আপদ সহায় সম্বলহীনদের তিনি নিদান কারী আবার আরোগ্যনিকেতন। 
তিনি ডাকের উদ্দেশ্যে রওনা হলেন সাথে পাহারাদার - সেই বংশ দণ্ড -ওষুধের পুঁটলি  অন্যান্য সামগ্রী। এবারের ফেরার আর নাম গন্ধ নেই তাঁর। লোকমারফত আসা -যাওয়ার খবর পাওয়া যেত। সেও হচ্ছেনা। বর্ধমান গ্রাম কে  আগের লোকের মুখেমুখে বলা হত  পশ্চিমের দেশ। গাঁ -গঞ্জের লোক চাষাবাদের সময় খাটতে যায়।তাদের মারফৎ খবরাখবর পাওয়া যেত।  এখন সেই মরশুম নয়। খরা চলছে।  
ভাবনাচিন্তার মধ্যে হঠাৎ সন্ধ্যে নামার মুখে গোধূলি বেলায় গরুরগাড়ি এসে থামল কবরেজবাড়ির সদর দরজায়। কবরেজ মশায়ের বোন ভাইপো কে নিয়ে দেখতে এসেছেন তাঁর সাথে প্রতিবেশীদের জটলা "কে এলা গো লতুন মানুষ গাঁয়ে"। 
এক পঞ্চদশী শ্যামলা বরণী ঘোমটা মাথায় নিরাভরণী কন্যে। পা দুটি আলতা মাখা। উঁচুকরে গাছকোমড় শাড়ী তে বেশ লাগছে। ঘরে প্রবেশ করে ছেলেকে কবরেজ মশায় বলেন এখনথেকে এই তোমার মা।বোনকে বলেন তোর সই। 
মা এবং পুত্রের বয়সের ব্যবধান চার -পাঁচ  বছরের।কয়েকমাস মাস কাটলো হঠাৎ কবরেজ মশাইয়ের শরীরে ক্লান্তি ঘিরে এল। চিকিৎসক মানুষ নিজের আয়ুকাল সম্বন্ধে সচেতন। তিনি চিন্তা ভাবনা করে  এই গ্রাম থেকে চারমাইল দূরে একগ্রামে জায়গা জমি  কিনে বাড়িঘর তৈরী করলেন। সেখানে তাঁর স্বজাতির বাস।স্ত্রী -ছেলে -বোন দের সঙ্গে নিয়ে ওই গ্রামে বাস করতে শুরু করেন।তাঁর যাতায়াত ছিল দুই গ্রামেই। গ্রামের লোকজন কবরেজমশাই এর যাবার দিন অরন্ধন পালন করেছিল।
 নতুন গাঁয়ে যাবার দিন থেকে অসহযোগিতা। একদিকে তাঁর নাম ডাক -অপরদিকে দ্বিতীয় বার -----।মোড়লদের আঁচে ঘি পড়েছিল সেদিন থেকে।  রাশভারী মানুষটির সামনে কেউ কিছু না বললেও কথা চালাচালি চলছে তার খবর আনছে তার ভগিনী। কবরেজ মশায় তার ধারধারেননা। বছর ঘুরতে না ঘুরতে গ্রীষ্মের দুপুরে মাত্র ঊনচল্লিশ বৎসর এ  সন্যাস রোগে আক্রান্ত। ঘৃতকুমারী   মাথায় লাগাতে বলার অবসরটুকু পেয়েছিলেন। কিছু ক্ষণের মধ্যে সবকিছু শেষ। গাঁয়ের লোকজন জমায়েত হল। নানান বিধান দিতে লাগলেন। সবচেয়ে বড়বিধান দাগলেন গাঁয়ের মোড়ল।বিধানটি হল কবরেজমশাই এ গাঁয়ে হঠাৎ ঘরবেঁধেছেন সুতরাং তিনি এখনও তাঁদের পঙতিতে গ্রহণ -বিসর্জন এর যোগ্য নন। মৃত দেহ পড়ে রইলো। কেও ছুঁলো না।
 অথই জলে  বালিকাবধূ -বালক পুত্রটি এবং কবরেজমশাই এর ভগিনী। বাচ্চাটাকে আঁকড়ে মা এবং পিসিমার কান্নায় -- কান পাতা কঠিন হলেও দুই কান সমৃদ্ধ মানুষের অভাব প্রকট । বাড়ির দেওয়াল থেকে কান্না ফিরেফিরে আসছিল।
খারাপ খবর মুখেমুখে রটতে থাকে।  লোক এল তাঁর সেই পুরনো নিজের গ্রামথেকে।অন্য গ্রামে থাকতেন কবরেজমশাই এর এক তুতো ভাই। তিনিও এলেন। প্রায় একদিন পরে তাঁর পরবর্তী কাজকর্ম সম্পন্ন হল।পরের দিনথেকে শুরু হল নতুন দিনলিপি। দিনলিপির সাল -তারিখ ছেলেটির মা এবং পিসিমা।ছেলেটি বড় হতে লাগল -------   

Tuesday, 23 May 2017

বড়মা 
পর্ব -এক 
আজথেকে প্রায় একশত বৎসর পূর্বের ঘটনা। বীরভূম জেলার প্রত্যন্তঃ গ্রামে এক কবিরাজ পরিবারের বাস।গ্রামের অন্যান্য জনসাধারণ বিভিন্ন শ্রেণীভুক্ত।  দারিদ্রসীমার নীচে তাঁদের  বাস। কিন্তু ওরা মানুষ অর্থাৎ মান ও হুঁশ দুটোই বর্তমান -প্রকট। কবিরাজ পরিবারটি বংশপরম্পরায় একটি পুত্রসন্তান এবং দুটি -তিনটি কন্যাসন্তানের অধিকারী। জমিজমা আছে সাথে আছে উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া গৃহদেবতার পূজা। আজও সেটি চলেআসছে। গ্রামের সকলে মান্যি করে -শরীর অসুস্থ হলে ওষুধপত্র দেওয়া ,পথ্য বিধান দেওয়া  থেকে পথ্য সামগ্রী যোগান এই সবই কবিরাজ পরিবার করে থাকে।নাড়ী স্পন্দন দেখে তাঁর আয়ুকাল বলে দিতেন কবরেজ মশায় । সকলে একডাকে  কবরেজ বাড়ী নামে চিনত। 
কবরেজ মানুষটি ছিলেন উদার মনের। খাদ্য রসিক -রাশভারী প্রকৃতির -এককথার মানুষ -পরোপকারী। তিনি একেকবারে একটি গোটা পাঁঠার মাংস সাবাড় করে দিতেন। রেগে গেলে সামলানো মুশকিল হত। কিন্তু পরক্ষনেই বরফ গলা জল। এহেন গুণ -দোষ নিয়েই তাঁর জীবন। গ্রামের মানুষ -আত্মীয় স্বজনের কাছে তিনি মসিহা। হিন্দু মুসলিম উভয়ই তাঁর বন্ধু। কবরেজের জমি চাষাবাদের দুইই ভাগীদার। দুই সম্প্রদায়ের মানুষজনের অবাধ যাতায়াত। পূজা থেকে পরব সবকর্মেই এই কবিরাজ বাড়ি।মুসলিমদের পরবে কবিরাজ বাড়িতে আসত সুগন্ধী চাল -ঘি -সেমুই -দুধ যাবতীয়। তাঁরা বলতেন এধে খাবেন। র বলতে পারতনা রেঁধে কে এধে বলত।  

ছোট বয়সে পিতৃহারা -মাতৃহারা হন। কিন্তু এক কায়স্থ পরিবার তাঁর এবং বোনের  উপযুক্ত হতে অভিভাবকের দায়িত্ব পালন করেন।সময়ে তিনি দ্বার পরিগ্রহ করেন। অপূর্ব সুন্দরী ছিলেন তাঁর পরিবার। কবরেজ মহাশয় ছিলেন দীর্ঘকায়। গাত্র বর্ণ ছল শ্যামউজ্জ্বল ।ভগিনীর বিবাহ হয়ে ছিল। বাল্যবিধবা হওয়ায় তাঁর শ্বশুরবাড়িতে ঠাঁই হয়নি।ভগিনীর বড় দাদা একরোখা প্রকৃতির ছিলেন।  বোনের অনাদর না হয় তাই নিজের বাড়িতে বোন কে আনলেন। বলেন এটা আমারও বাড়ী আবার তাঁর ও বাড়ি। ননদিনি আর বৌদিদি দুই বন্ধুর মত হয়ে উঠলো।  
ঘর আলোকরে কবরেজ গিন্নির কোলে এল শিশু সন্তান। পরম্পরা মেনে শিশুটি পুত্রসন্তান। এভাবেই দিনচলছিলো। কবরেজ মহাশয় কে প্রায় ডাক এ রুগী দেখতে যেতে  হয়।সাথী একজন সর্বক্ষণের সহযোগী -ওষুধের পুঁটলি এবং লণ্ঠন। পাহারাদারের হাতে সরষের তেল মাখানো পাকাবংশদণ্ড। ডাকাতের ভীষণ উপদ্রব। আত্ম রক্ষার্থে। পথ চলতে মাঝে মধ্যে ভেসে ওঠে "কে যায় এত রাতে ?"---উত্তর আসে কবরেজ যায়।আশ্বাস দেয় চিন্তা নেই "আমরা জেগে আছি "--  
দূরদূরান্তে যেতেহতো রুগী দেখতে। কখনও ফিরতে ফিরতে চার -পাঁচ দিন লেগে যেত।  পায়ে হেঁটে যাওয়া আসা। কালেভদ্রে গরুরগাড়ি।  শিশু তাঁর মা এবং পিসিমার কাছে বড় হতে লাগল। তাঁর সাথে গ্রামের মানুষের সহযোগিতা। 
ছেলেটি  সবে দশ কি এগারোয় পা দিয়েছে হঠাৎ ছন্দপতন। তাঁর মাতৃ বিয়োগ হল। কবরেজ মশায় পড়লেন অথৈ জলে---.




                          
  

Sunday, 21 May 2017

অধরা মাধুরী 
অন্তিম পর্ব
#মৌসুমী রায়

বিদায় বন্ধু। যেতে নাহি দিব --কথোপকথন চলছে মনের মাঝে। এতসবুজ আগে কখনও দেখাহয়নি। জঙ্গলের মাদকতা বিভোর করেছে। আজ জিড়িয়ে নিয়ে আগামীকাল ফেরার পালা। মনের খিদে আটকানো ভীষণ কঠিন। মন ভরতেই চায়না। শেষ নেই যে -শেষ কথা কে বলবে। যাবার আগে মন খারাপের আসন না পেতে আবার একটু ঘুরে আসি। একটু মিষ্টি মুখ। যেমন লুচি দিয়ে যতই সুস্বাদু মিষ্টি খাওয়া যাক না কেন -ওই যে শেষ লুচি টি ফুটো করে চিনি দিয়ে খাবার কিযে তৃপ্তি বোঝানো যায়না কাউকে। সেই ফুলকো লুচি আর চিনি হলো মৌয়ের লাভা এবং ঋষভ ভ্রমণ । ওখানে রাস্তায় দেখলাম ঋষি লেখা আছে। সে আছে তার মত। 
লাভা যাওয়ার পথে প্রকৃতির সাজ। রঙের সাজুয্য নান্দনিক। সমতলে যেমন যাত্রা পথে প্রায়শঃ ধানক্ষেত দেখাযায় তেমনই ডুয়ার্স থেকে পাহাড় পথে চাবাগানের সমারোহ। ঢেউ খেলানো সবুজ চাদর বিছানো। চাবাগিচায় মেয়েরা টুকরি নিয়ে চা পাতা তুলছে। একটি কুঁড়ি দুটি পাতা। মেয়েরা নরম মসৃণ আঙুলের যাদুতে সম্পন্ন করছে। চাগাছের বীজ এবং ফুল ও নজর কাড়লো।
পাহাড় পথে  কখনো মেঘ -রোদ -আবার বৃষ্টি। দেবদারু -পাইন গাছের বন।আবার কোথাও দুটি গাছ একসাথে জড়িয়ে বড় হচ্ছে যে যার মত। কোনও বিদ্রোহ নেই। তাঁদের স্লোগান বাঁচো বাঁচাও।  প্রকৃতি সৌন্দর্যে মন খিদে আরও বাড়ছে।লাভা পৌঁছে দেখা পেলাম বৌদ্ধ দের উপাসনা গৃহ -বৌদ্ধ স ন্যাসীদের পড়াশোনার স্থান। বুদ্ধদেব  শান্ত স্নিগ্ধতায় বিরাজমান। সন্যাসীরা তাঁদের কথাবার্তা কাজকম্মে নিমগ্ন। 
তাঁর সংলগ্ন লাভা উচ্চবিদ্যালয়। পাশেই বাচ্চাদের পড়াশোনা করার বিদ্যালয়। যখন পৌঁছানো গেল লাভায় তখন বাচ্চাদের ছুটি হয়েছে। কিযে মিষ্টি লাগছে ওদের যেন একেকটি পাহাড়ী ফুল। যত্নে ঈশ্বর সাজিয়েছেন। 
তার মাঝে বড়ো বিদ্যালয়ের জলযোগের সময় হয়েছে। ঘন্টাপড়লো -ওরা কেও সংলগ্ন মাঠে খেলা শুরুকরল -আবার কেও নিজেদের ভাষায় বাকবিনিময়ে  মশগুল।  
একটি জলাধার প্রকল্পের কাজ ও নজরে এলো। খাওয়া দাওয়ার পর, মানে পেটের খিদে মিটিয়ে মনের খিদে মেটাতে তখন বেশ লাগছে।  লাভা আসার পুর্বে গাড়িচালক ঋষি বা ঋষভ ভিউপয়েন্ট ঘুড়িয়ে নিয়ে এল। ঋষভ এর রাস্তা খুব বন্ধুর। গাড়ি আটকে যাই যাই তখন প্রকৃতি দেখব কী -ঈশ্বর নাম জপছি। এভাবে যেতে যেতে প্রকৃতি কে যে ভাবে দেখাগেলো বর্ণনার অতীত। পাখির ডাক -কোনপাখি ডাকছে তার নজর করার যো নেই।গাছের পাতার রঙে রংমিলান্তি। কাঞ্চনজঙ্ঘা বরফ সাজে সেজে আছে।মুকুট -গলার হার -টায়রা -টিকলি -নথ সবই পড়েছে। নীলাকাশের মাঝে -বরফ ভেঙে ডিঙিয়ে যাওয়া সাধ্যি নাই যে আমার ক্ষমতার কাছে।   ওপারে ভূটান -সেখানে রোদঝলমল। সবুজ ঘেরা পাহাড় মাঝে বাড়ির ছাদগুলো রোদের ছটা চোখ টানছে।দুপুরের পর থেকে পাহাড় অন্য রূপ ধারণ করে। সুতরাং সুন্দর কে দেখার জন্য এই মানব জাতিকে বাঁচতে হবে। অগত্যা ফিরতে হবে মাটির টানে।  ফেরার পথে আবার পাহাড় -ফুল -পাখি বন্ধুদের বিদায় জানানোর পালা। ওরাও  জানালো তবে বিদায় নয়। জানালো ভালথাকার মন্ত্র। বললো আবার দেখাহবে বন্ধু। 
মাধুরী অধরা। মনচক্ষু এর সমঝদার।মুখে  বোলে বা ছবিতে বোঝানো যায়না। সত্যি তুমি অধরা মাধুরী ধরেছো ছন্দ বন্ধনে। 

Saturday, 20 May 2017

অধরা মাধুরী 
পঞ্চম পর্ব
 #মৌসুমী রায় 

গত রাত থেকে মৌয়ের মনে ঘুরপাক খাচ্ছে সেই কথা টি। সেইটি প্রায় সে গীতা শ্লোকের মতো মনে মনে আউড়ে যাচ্ছে। কখন ভোর হবে আর সেই কথাটি সুরে বাজবে। প্রথমতঃ তরাই -ডুয়ার্সের আকর্ষণ। সঙ্গী হলো উত্তরবঙ্গের স্থানগুলির নামকরণ। লাটাগুড়ি -ময়নাগুড়ি -ধূপগুড়ি -বিন্নাগুড়ি -ফাঁসিদেওয়া -হাসিমারা -রাজাভাতখাওয়া -কুনকি -গরুমারা -জলদাপাড়া আরও কতকি। নামেই সে প্রেমে পড়েছে। তারসাথে সেই কথাটি --
কথাটি হল ফরাসী প্রবাদ এ আছে যে একটি গাছ অনেক সময় পুরো জঙ্গল ঢেকে দেয়। 
ডুয়ার্স তো গাছেগাছে বিপ্লব ঘটিয়েছে -আর তাঁর বিপ্লবী ভাই বোনেরা বিপ্লব অমর করেছে। সেই বিপ্লবীরা বনের জীবজন্তু -কীট -পতঙ্গ। ডুয়ার্সের জঙ্গল এর শিল্প প্রদর্শন নয় এর সৌন্দর্য শিল্প বিপ্লব। 

ভোরহতে না হতেই তৈরী জঙ্গল ভ্রমণের উদ্যেশ্যে। সাথে গাড়ীর চালক আর পরিচয় সহায়ক।ভোরের মিষ্টিহাওয়া -বনের মিষ্টি গন্ধ -পাখীর ডাক দিয়ে যাওয়া -ঝিঁঝি পোকার সুর -ছন্দবদ্ধ নিয়ে যাত্রা শুরু। যাত্রাপ্রসাদ জঙ্গল সফর। যাত্রাপ্রসাদ নামকরণ একটি হাতীর নামানুসারে।  যেতেযেতে ময়ূর পেখম টাকে রাস্তার উপর ঝাড়ু দিয়ে বয়ে নিয়ে যাচ্ছে। গাড়ীর শব্দে ওমনি ফুড়ুৎ। পাখিরা গাছে দোল দিয়ে নানান সুরে গাইছে। বনমোরগ খুঁটেখুঁটে কী খাচ্ছে -চকিতে হরিনের আগমন -প্রস্থান। পরিচয় সহায়কের দৃষ্টির তারিফ করতে হয়।কোথায় ময়ূর তাঁর পেখম রেখেছে সেটিও চালক -সহায়কের নজর এড়ায় না। ভীষণ দক্ষ।  তাঁদের সরলতা অনুভব করলে  মনে শান্তি আনে।তাঁদের  মুখে হাসিলেগে -আর পর্যটক কে হাতী -গন্ডার -বাইসন দেখানোর চেষ্টা। পর্যটক বনের জীবজন্তু  দেখলেই ওদের কিযে আনন্দ না দেখলে বোঝানো যাবেনা।হ্যাঁ যাত্রাপ্রসাদে হাতীর দল ঘুরছে -নানান বর্ণ -প্রজাতির পাখির ঝটপট শব্দের  আসাযাওয়া মনের ছবিতে এঁকে রাখছে। যন্ত্র ছবিতে ধরতে গেলে তাঁদের খেলাখেলি দেখাযাবেনা। 
সফর সেরে লাটাগুড়ি তে ফেরা। লাটাগুড়িতেই ডেরা বাঁধা। আবার বিকেল বেলা মেডলা জঙ্গল। ... এখানে প্রথমে মহিষের গাড়ি করে জঙ্গলে পৌঁছনো। সেখানেও গন্ডার -বাইসন -হাতি -ময়ূর -ময়ূরী -হরিণের দেখা। সবে বৃষ্টি হয়েছে বড়বড় ঘাসে হাতীর থামের মত পা পড়তেই জলের ফোয়ারা -যা পূর্বে দেখিনি। লবনপাত্র রাখা আছে সেখানে লবন-গুড় খেতে আসে গণ্ডারের দল।সন্ধ্যে হবেহবে ফেরার পথে আদিবাসী নাচনী আখড়ায় নৃত্য -সংগীত প্রদর্শন। আদিবাসী সুর -নৃত্য ভঙ্গিতে আজও তাঁরা তাঁদের কৃষ্টি বাঁচিয়ে রেখেছে।  তার সাথে চা -বিস্কুট। টিকিট ব্যবস্থার মাধ্যমে এগুলি পরিচালিত।সাথে পাওয়া যাচ্ছে চাবি বন্ধন -ধূপকাঠি। সবই আদিবাসীদের তৈরী।টিকিটের সাথে এগুলি পর্যটকদের দেওয়াহয়।  এর অর্থ আদিবাসী কল্যাণে খরচ হয়। ২০০৬ সাল থেকে এর যাত্রাশুরু। রাত্রি হয়েছে ফিরতে ফিরতে জঙ্গলের মাঝবরাবর রাস্তা -গাড়িরচালক পিকু জানায় হঠাৎ হঠাৎ হাতি আসে এই রাস্তায়। জোৎস্না মাখানো বনের পথে বনের সৌন্দর্য উছলে পড়ছে।  মাঝেমাঝে গাড়ির আলো বন্ধকরে দলবদ্ধ জোনাকির আলো দেখাচ্ছে। রোমাঞ্চকর মনে হচ্ছিলো। 
সেই আবেশ কাটতে না কাটতে পরের দিন টানা তিনঘন্টা জঙ্গল সফর। ভাম এরসাথে দেখা তাঁর গায়ের গন্ধ আতপ চালের মত। বাইসন তার বাচ্চাদের নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। হাতি তার পরিবার নিয়ে বেরিয়েছে। পর্যটকদের ছবিও তুলতে দিচ্ছে। বেতগাছের পাতা ভেঙে সামনের পা দিয়ে আয়ত্তে এনে মুখে পুড়ছে। গরমকাল -হাতি স্নিগ্ধ হওয়ার জন্য মাটিসমেত ঘাস উপড়িয়ে পিঠে রাখছে। বকের সারি গন্ডারের পিঠে চেপে চলেছে। 
ওরা কত সুন্দর এই কথাটি মনেমনে উচ্চারিত হল। ---তোমার প্রেমে ধন্য করেছ মোরে ডুয়ার্স। ---চোপড়ামারী যাত্রাপথে হাতিনাদেখলেও ধনেশ পাখির দেখামিললো -দেখামিললো মদনটাক পাখির। প্রকৃতির সাথে তাদের সহাবস্থান মনের আনন্দ এক অন্য মাত্রা পায়। ---ডুয়ার্স বলছে "এখুনি কি হলো তোমার যাবার বেলা --হায় অতিথি। দেখ আমার হৃদয় তলে সারা রাতের আসন মেলা। "-----

Friday, 19 May 2017

অধরা মাধুরী 
চতুর্থ পর্ব
#মৌসুমী রায়

ইতিহাস কথা বলে।স্বচক্ষে দেখার ইচ্ছে-দেখা বাস্তবতার সামিল। উত্তরবঙ্গের বক্সা দূর্গ তাঁর নিদর্শন। ইতিহাস কে ছুঁয়ে দেখার বাসনায় বক্সা উদ্দেশ্যে রওনা।পদ যুগল আশ্রয় করে সঙ্গী সহায়ক নিয়ে চলা শুরু।  চড়াই -উতরাই পথ। চলতি পথে ক্লান্তি পথ আটকানোর চেষ্টায়।কিন্তু মন তখন জেগে উঠেছে -বলছে যা দেখে যা স্বাধীনতা এনেছেন যারা তাদের কষ্ট -তাদের চিন্তা ধারা। 
এভাবেই মনে মন কথায় কথায় কখন পৌঁছে গেলাম বহু প্রতীক্ষিত বক্সা দূর্গে। এখানেই স্বাধীনতা সংগ্রামী দের বন্দী করে রেখেছিলো ইংরেজরা। তাঁদের কী কষ্ট যাপন করতে হয়েছিল তা আজও দ্বন্দ্ব  -দীর্ণ অবস্থায় দণ্ডায়মান।রক্ষনা বেক্ষনের বড়ই অভাব। অন্যান্য বন্দীদের সঙ্গী বন্দী ছিলেন নেতাজী সুভাষচন্দ্র বোস। তাঁকে নিয়েই ইংরেজদের মাথার গন্ডগোল। সুতরাং বক্সা দুর্গ যে কী দুর্গম স্থান তা সহজেই অনুমেয়। ১৯৩১ সালে বন্দীরা শ্রী রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর কে তাঁদের অসহনীয় অত্যাচার -নির্যাতনের কথা পত্র মারফৎ জানান। কবিগুরু যারপরন্যায় ব্যথিত 
  তাঁদের কষ্টে। তিনিও তাঁদের প্রত্যুত্তর পত্র পাঠান। তিনিও সমব্যাথী। লেখার মাঝে একজায়গায় লিখছেন "ফোয়ারার রন্ধ্র হতে -উন্মুখর উর্দ্ধ স্রোতে"--। দুটি চিঠির ফলক নির্মিত সেখানে। বন্দীদের পানীয় জল থেকে বঞ্চিত করার প্রকল্প নেয় ইংরেজরা।দূর্গ লাগোয়া জলাশয় বন্ধকরে দেয়। আজও সেখানকার বসবাসকারী জনগণ তাঁর ফল ভোগ করেচলেছে। 
একদিকে ইতিহাস ছুঁয়ে দেখার আনন্দ অপরদিকে স্বাধীনতা সংগ্রামী দের সংগ্রাম দুয়ের দ্বন্দ্বে  দ্বিখণ্ডিত। 
ফেরার পথে মনে হলনা পাহাড়ে ওঠার কষ্টের কথা।
  
পাশেই বয়েচলেছে জয়ন্তী নদী।কত ইতিহাসের সাক্ষী।কত জল বয়ে গিয়েছে -বইবে আরো কত ---
সেও এক অনন্য সুন্দরী দেহে -মনে। রূপে শুধু ভোলায়না গুণেরও মাধুকরী। বক্সার মধুর ক্লান্তি কে অনায়াসে লাঘব মন্ত্রে অনুরণন ঘটায় তাঁর বহমান ধারার ধারায়। 
ইতিহাস সাথেই চলেছে আর নিজেরা নিজেকে ধন্য মনে হচ্ছে। ঈশ্বর কে শুধু কৃতজ্ঞতা -অনেক দিয়েছ নাথ। 
চলতে চলতে পথে রাজাভাতখাওয়া। দুই রাজার সন্ধি এবং ভাত খাওয়া। সেই ভাত খাওয়া আজও ভারত -ভুটান খেয়েচলেছে -চলবেও। শুধু খাওয়া নয় চলছে তার সাথে দাওয়া -ও। ------
  

Thursday, 18 May 2017

অধরা মাধুরী
তৃতীয় পর্ব 
#মৌসুমী রায় 

পথের সাথী জলঢাকা। পথ চিনিয়ে নিয়ে চলেছে নদী নতুন ঠিকানার খোঁজে। চলতে চলতে নদীর কোথাও জল তো কোথাও নুড়ি পাথর। এই সেই মধ্যবর্তী জলস্থল এ এক সুন্দরীর খোঁজ মিলল। প্রকৃতি তাঁর চন্দন -কুমকুম -ওড়না দিয়ে কনে সাজিয়ে রেখেছে। নামটি তাঁর ঝালং। পাহাড় ঘেরা সাজে তাঁর বসত নীল আকাশের মাঝে। তার এ পাড়েতে ভারত মাতা -ও পাড়েতে ভূটান।ঝালংএর মন মর্জি ক্ষণে ক্ষণে বদলায়। মেঘ পিওনের চিঠির প্রাপ্তি স্বীকারের ওপর। মনে মেঘ হলে বৃষ্টি আসবেই।সেই মেঘ কে বৃষ্টি ধারায় আনতে মিলবে পাহাড়ের মিষ্টি মেয়ের হাতের তৈরী ধোঁয়া ওঠা মোমো -চা -কফি। সাথে রৌদ্র -ছায়ার খেলা। ঝালং ঘিরেছে সবুজ গাছ -পাহাড় -নদী -ফুল -পাখি। 
চলতে পথে মিলল দেখা ভারতবর্ষের উত্তরবঙ্গের শেষ গ্রাম। নামটি তাঁর বিন্দু। পূর্ণচ্ছেদ -বিন্দু। প্রকৃতির কোনো পূর্ণচ্ছেদ নেই -তার ব্যাপ্তি অতল -অসীম। বিন্দু নামটি সাহিত্যের বিন্দুবাসিনীর কথা মনে পড়ায়। পাহাড় ঘেরা সাজে বিন্দু নীল আকাশের মাঝে। বিন্দু পরম স্নেহের বন্ধনে সেতু বন্ধন করেছে ভুটানের সাথে। তাঁদের আতিথেয়তা দিচ্ছে আমাদের দেশের অতন্দ্র প্রহরী সৈনিক।
এখানেই জলঢাকা বিদ্যুৎ প্রকল্প।  হৃষ্টপুষ্ট সারমেয়র দল চলেছে সাথে। ছবি তুলতে পারদর্শী কিন্তূ রেগে গেলে ভয়ংকর।
সৌন্দর্য চোখে -মুখে নিয়ে ফেরা। বিদায় জানাতে আবার ঝালং -পাহাড় -নদী -পাইন হাজির। আবার এস ফিরে। ভালো থেকো -প্রকৃতি বাঁচিয়ে রেখো। ফেরার পথে অন্য  পথের খোঁজ পেড়েছে বক্সা -জয়ন্তী রা। ----

Wednesday, 17 May 2017

অধরা মাধুরী 
দ্বিতীয় পর্ব
#মৌসুমী রায় 

উত্তরবঙ্গের নেওরা নদীর তীরবর্তী এই লাটাগুড়ি। নেওরা নদী আর তার আশেপাশে বসতি -গাছগাছালি প্রকৃতিরে সাজায়ে তুলেছে।আদিবাসী মানুষজনের আনাগোনা -তাদের অল্পসল্প শাকসবজি নিয়ে বসানো হাট -সেখানে কেনাবেচা চলছে। মেয়েরা হাঁড়িয়া নিয়ে বসেছে-সেখানে কিছু পুরুষের আনাগোনা। রাস্তার দুই পাশে যতদূর চোখ যায় শুধুই চাবাগান আর চাবাগান -সবুজে চোখ ধাঁধায় -চোখ আরাম পায়।   চাগাছের মাঝে মাঝে নামকরণ করা বড়ো বৃক্ষ -সেই বৃক্ষ কে আলিঙ্গন কোরে আছে গোলমরিচের গাছ।প্রকৃতির সহাবস্থান মন কে থামিয়ে ভাবতে শেখায় -তোমরা মানুষেরা এভাবে বাঁচো -দেখো ভালো থাকবে।  
গাছেগাছে নানান ফুলফুটেছে -এদের আকৃতি প্রকৃতি দক্ষিণবঙ্গের ফুলের তুলনায় বেশ পুষ্টি লাভ করেছে। রাতের বেলা এদের সৌন্দর্য দিনের আলোর মতো উজ্জ্বল।রাতের জঙ্গল যেন সৌন্দর্যের মধ্যে ভয়ংকর সুন্দরী খেতাব আদায় করে নিয়েছে।  উপভোগ করতে করতে  গা  ছমছম অনুভূতি। সাথে বুনো মিষ্টি গাছের গন্ধ মন মাতাল। গ্রাম্য ভাব আবার তার সাথে মানুষজন এতো মিষ্টি যে তাদের ভাষাতেও সেটা নজর কারে। 
নদীটির নাম মূর্তি -সে তার রূপের পসরা সাজিয়ে বসে রয়েছে। ঝিরিঝিরি বইছে বারোমাস। তারজন্য সে আজ চারানা কাল চারানা দাবি করেনা। বলে যেন এস কাছে একটু হাতে -পায়ে জল নাও স্নিগ্ধ হও। এখানে বৃষ্টিপড়ে বারোমাস -গাছগুলো ছায়া দেয় -আগল দেয় মা -বাবার ভালোবাসার মত। বৃষ্টির জল মাটির বুকের মাঝে বন্দি।
মেঘথেকে পড়ে মৃত্তিকাতে মেশে। ধরণী সবুজেসবুজ বনানী বিথীকায়।মূর্তিনদির যাত্রাপথে ময়ূর -ময়ূরী -বন মোরগ -রংবেরংয়ের পাখির সাথে দেখা। কখনো হরিণ -হঠাৎ তার ছুটে যাওয়া -সবই পলক এর মাঝে। 
কত যে নদী -আর নদী -যেন প্রকৃতির গলায় রূপালী গলাবন্ধ এঁকেছে।   পাহাড়ের গায়ে পড়িয়েছে যে কণ্ঠহার সে জলঢাকা ।পাহাড় -নদী -গাছ -ফুল -পাখি নিয়ে এগিয়ে চলেছে পথ দেখিয়ে জলঢাকা। নতুন পথের সন্ধানে। ------